নির্যাতন, মানবপাচার ও গুরুতর সহিংসতার শিকার আশ্রয়প্রার্থীদের অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতে বাধ্য করে যুক্তরাজ্য সরকার বেআইনি কাজ করেছে বলে রায় দিয়েছেন দেশটির হাইকোর্ট। এই রায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য যৌথ আবাসন ও সাবেক সেনা ব্যারাক ব্যবহারের পরিকল্পনার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বিচারপতি মিস্টার জাস্টিস সুইটিং বলেন, সরকার নীতিগত পরিবর্তনের আগে নির্যাতন ও মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরামর্শ না করাকেও আদালত সরকারি দায়িত্বের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
গার্ডিয়ানের হাতে আসা আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের যৌথ কক্ষে রাখার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারাবাহিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সরকার তা উপেক্ষা করেছে।
মামলাটি যৌথভাবে দায়ের করে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা দুই দাতব্য সংস্থা—ফ্রিডম ফ্রম টর্চার এবং হেলেন ব্যাম্বার ফাউন্ডেশন। তারা অভিযোগ করে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগের সরকার একটি নতুন নীতি চালু করে, যার মাধ্যমে নির্যাতন, মানবপাচার ও যৌন সহিংসতার শিকার আশ্রয়প্রার্থীদের অপরিচিতদের সঙ্গে কক্ষ ভাগাভাগি করতে বাধ্য করা হয়। এর আগে তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছিল।
সংস্থাগুলোর দাবি, বর্তমান সরকারও সেই নীতি বহাল রেখেছে এবং এর ফলে অনেক ভুক্তভোগী নতুন করে মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন।
ফ্রিডম ফ্রম টর্চারের অ্যাডভোকেসি বিভাগের সহযোগী পরিচালক নাতাশা সাঙ্গারিদেস এই রায়কে “নির্যাতনের শিকারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে নির্যাতনের শিকার মানুষদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।”
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এই ব্যর্থতার কারণে নীতিগত পরিবর্তন বেআইনি হয়ে গেছে।
এই রায়ের ফলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বড় ধরনের চাপে পড়েছে। মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আগের নীতিতে ফিরে যাবে, নাকি নতুন করে বিশেষজ্ঞ মতামত, আনুষ্ঠানিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ শেষে পুনরায় নীতি চালু করবে।
বর্তমান লেবার সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেল থেকে সরিয়ে যৌথ আবাসন ও সাবেক সামরিক ব্যারাকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য পার্লামেন্টের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই হোটেল ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।
ইতোমধ্যে পূর্ব সাসেক্সের ক্রাউবরো এলাকায় অবস্থিত একটি সাবেক সেনা ব্যারাকে প্রায় ৩৫০ জন আশ্রয়প্রার্থীকে রাখা হয়েছে। এছাড়া ইনভারনেসের ক্যামেরন ব্যারাকে আরও ৩০০ জনকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও তা বিলম্বের মুখে পড়েছে।
হেলেন ব্যাম্বার ফাউন্ডেশনের পরিচালক কামেনা ডরলিং বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের বড় আবাসনকেন্দ্র ও যৌথ কক্ষে পাঠানো ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করেছে।”
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা আদালতের রায় সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করবে। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, “আগের সরকারের সময় ব্যবহৃত বড় আবাসনকেন্দ্র থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মান বজায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে।”
একই সময়ে সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের বয়স নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে। হারলোভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আখতার কম্পিউটার্সকে এ জন্য ৩ লাখ ২২ হাজার পাউন্ডের একটি চুক্তি দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিশু দাবি করা আশ্রয়প্রার্থীদের বয়স নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হবে। কারণ ১৮ বছরের কম বয়সী আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী আলাদা সুবিধা ও সুরক্ষা প্রযোজ্য হয়।
তবে সমালোচকরা বলছেন, বয়স নির্ধারণে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গত বছরের এক সরকারি প্রতিবেদনে ডোভারের ওয়েস্টার্ন জেট ফয়েল রিসেপশন সেন্টারের কিছু কর্মকর্তার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই রায় শুধু আশ্রয়নীতির বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং লেবার সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতির মানবাধিকারগত দিক নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

