ইউনিসেফ বাংলাদেশের একাধিক সতর্কবার্তা, চিঠি ও জরুরি বৈঠকের পরও সময়মতো হামের টিকা সংগ্রহ করতে পারেনি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তহীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কেনাকাটার পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় দেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এতে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৪৭৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ইউনিসেফের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টিকা ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর থেকেই সংস্থাটি অন্তর্বর্তী সরকারকে ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করতে থাকে। অন্তত ৫টি পৃথক চিঠির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীলদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রায় ১০টি বৈঠকে টিকা সংকটের সম্ভাব্য ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টিকা কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ক্রয় পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা চলতে থাকে। পূর্ববর্তী সরাসরি ক্রয় ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন পদ্ধতি কার্যকর করার আলোচনা, ফাইল প্রক্রিয়াকরণে ধীরগতি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদনের বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হামের টিকা দেশে আনা সম্ভব হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে টিকার সরবরাহে সামান্য বিলম্বও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রোগটির সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি হওয়ায় আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় হামের টিকার মজুত দ্রুত কমে আসছিল।
ইউনিসেফ একাধিকবার সরকারকে জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকা সরবরাহে সময় লাগে এবং আগাম ক্রয়াদেশ না দিলে সংকট তৈরি হবে। তবুও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে চূড়ান্ত ক্রয়াদেশ দিতে বিলম্ব হয়।
হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মধ্যে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকেরা জানান, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার আরও বেশি ছিল। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকার অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে।
এদিকে টিকা সংকট ও শিশুমৃত্যুর ঘটনার পেছনে কোনো ধরনের গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, টিকা ক্রয়ের নথিপত্র, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধাপ এবং বিলম্বের কারণ বিশ্লেষণ করা হবে বলে জানা গেছে। তদন্তে প্রশাসনিক ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক এই সংকট জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে জরুরি স্বাস্থ্যপণ্য ক্রয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, সময়মতো টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এত বড় আকারে সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল। এখন দ্রুত টিকা সরবরাহ বৃদ্ধি, জরুরি টিকাদান অভিযান এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালুর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রঃ ইত্তেফাক
এম.কে

