15.7 C
London
May 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

৪৫ ডিগ্রি তাপপ্রবাহে পুড়তে পারে ব্রিটেন, বাড়বে দারিদ্র্য ও বৈষম্যঃ ভয়ঙ্কর প্রতিবেদন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভয়াবহ সংকটের দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য। আগামী দুই দশকের মধ্যে দেশটিতে তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে, বাড়তে পারে ভয়াবহ বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যুক্তরাজ্য আরও অস্থিতিশীল ও বৈষম্যমূলক সমাজে পরিণত হতে পারে।

বুধবার প্রকাশিত জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কমিটির এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই স্বাভাবিকের তুলনায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আগামী দুই দশকে তা আরও ২ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে দেশটিতে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে, যা ২০২২ সালের রেকর্ড ৪০ ডিগ্রিকেও ছাড়িয়ে যাবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে তীব্র গরম চলতে পারে। একইসঙ্গে খরা ও ভয়াবহ বন্যার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো এমন এক জলবায়ুর জন্য নির্মিত হয়েছিল, যা এখন আর বাস্তবে নেই। ফলে পরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, হাসপাতাল, স্কুল, বাসাবাড়ি ও বৃদ্ধাশ্রম—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্ন আয়ের মানুষরা।

কারণ ধনী পরিবারগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উন্নত আবাসন কিংবা বন্যা প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলেও দরিদ্রদের সেই সামর্থ্য নেই।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারীরা অতিরিক্ত গরমে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকবেন। যেসব পরিবার ঘর ঠান্ডা রাখার সামর্থ্য রাখে না, সেখানে অকাল প্রসব, মৃত সন্তান জন্ম এবং বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

শিক্ষাব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি হলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যদিও ২০৫০ সালের মধ্যে সব স্কুলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তবে বাজেট সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত।

এছাড়া “ক্রান্তীয় রাত” নামে পরিচিত এমন রাতের সংখ্যা বাড়বে, যখন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নামবে না। এতে শিশু ও শিক্ষার্থীদের ঘুমের সমস্যা এবং শারীরিক দুর্বলতা বাড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ব্রিটেনের প্রতি ১০টি বাড়ির মধ্যে ৯টিই অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো হয়তো পুরো ঘর নয়, কেবল একটি কক্ষ ঠান্ডা রাখতেই সক্ষম হবে।
খাদ্য নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি ও জলবায়ু গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু সংকটের কারণে একটি পরিবারের বার্ষিক খাদ্য ব্যয় গড়ে প্রায় ৩৬০ পাউন্ড বেড়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় আগামী নভেম্বরের মধ্যে খাদ্যের দাম আরও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ধনী পরিবারগুলো কোনোভাবে টিকে থাকতে পারলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বে।

বন্যার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য দেখা যাবে। উচ্চ আয়ের মানুষরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে যেতে বা নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষদের অনেকেই বিপজ্জনক এলাকাতেই আটকে থাকবেন।

গ্রীন অ্যালায়েন্স গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সামাজিক প্রভাব বিভাগের প্রধান ক্যাথ স্মিথ বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমাজের সবাই সমানভাবে অনুভব করে না। আয়, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও অবস্থানগত বৈষম্যের কারণে কিছু মানুষ অনেক বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি এই অসম প্রভাবকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইপিপিআরের সহযোগী পরিচালক স্যাম আলভিস বলেছেন, জলবায়ু সংকট রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়াতে পারে। তার মতে, সরকার যথাযথ প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হলে উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলো জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক ডক্টর ফ্রিডেরিকে অটো বলেছেন, যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই ভয়াবহ খরা, তীব্র গরম ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপূর্ণ শীতের বাস্তবতা অনুভব করছে।

তার মতে, শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়। জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে নিট শূন্য নির্গমন নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকটই নয়, বরং যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

রানির কফিনের সামনে যাওয়ার চেষ্টা, গ্রেফতার ১

যুক্তরাজ্যে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় জয়, কনজারভেটিরা ধরাশায়ী

ইরান হামলা ইস্যুতে লন্ডন-ওয়াশিংটন টানাপোড়েন, স্টারমারের ওপর ‘খুবই হতাশ’ ট্রাম্প