দেশে আবারও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে হামের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য খাতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রায় ৫৮ থেকে ৬৪টি জেলায় ইতোমধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু হলেও বর্তমানে বড়দের মধ্যেও আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং কিছু এলাকায় টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব শিশু জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এমআর টিকার দুই ডোজ সম্পূর্ণ করতে পারেনি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে অতীতে হাম না হওয়া কিংবা পূর্ণ টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্করাও এখন আক্রান্ত হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। জাতীয় ইপিআই কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম এমআর টিকা এবং ১৫ মাস বয়সের পর দ্বিতীয় বা বুস্টার ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুর টিকা বাদ পড়ে থাকলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে তা সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এজন্য উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত আলাদা রাখতে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, হামকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করলে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও অপুষ্টির মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে। তাই আক্রান্তদের পর্যাপ্ত তরল খাবার, পুষ্টিকর খাদ্য ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করারও নির্দেশনা দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশু রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। অনেক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে শয্যা সংকটও দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশবাসীকে গুজব বা বিভ্রান্তিতে কান না দিয়ে শিশুদের পূর্ণ টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে যাদের টিকা নেওয়া হয়নি বা টিকার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এমএমআর টিকা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকাদান ও সচেতনতা বাড়ানো না গেলে দেশে হামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও রাষ্ট্র—উভয় পর্যায়েই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
সূত্রঃ ইত্তেফাক
এম.কে

