উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল সেউতা সীমান্তে জুলাইয়ের নজিরবিহীন গণ-অনুপ্রবেশ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সরকারের কাছে থাকা সংকট-সংক্রান্ত নথি জনসমক্ষে প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ৩ সেপ্টেম্বর স্পেনের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সেউতা সংকট মোকাবিলায় সরকারের ‘লুকানোর কিছু নেই’ এবং জনগণের পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ করা হবে।
জুলাইয়ের ৩০ ও ৩১ তারিখে মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। স্পেনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সংকটের সময় প্রায় ৭২ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছিল। ঘটনাটি স্পেনজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং সরকারের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা তীব্র হয়।
পার্লামেন্টে সানচেজ জানান, সংকটের প্রথম পর্যায়ে সরকারের দুটি প্রধান লক্ষ্য ছিল—সীমান্ত শক্তিশালী করা এবং স্পেনে থাকার আইনগত অধিকার না থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত মরক্কোয় ফেরত পাঠানো। তার দাবি, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মরক্কোয় ফিরে যায় এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬৩ হাজারে পৌঁছায়, যা সীমান্ত অতিক্রমকারীদের ৯০ শতাংশের বেশি। তিনি এটিকে ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন।
সানচেজ সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী স্প্যানিশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও প্রকাশ্যে সমর্থন করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি আকস্মিকভাবে বদলে যাওয়ার পর কর্মকর্তাদের সামনে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবন রক্ষার মধ্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, কর্মকর্তারা মানুষের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং তার মতে সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
সেউতায় গণ-অনুপ্রবেশের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্পেনের অভিবাসন আইন ও আদালতের একটি রায়কে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এসব বার্তা সীমান্ত পার হওয়ার বিষয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করেছিল। একই সঙ্গে অপরাধী চক্র ও মুনাফালোভী ব্যক্তিরা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত পারাপারে সহায়তাকারী সরঞ্জাম ও সেবা বিক্রির চেষ্টা করেছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে সেউতা সংকটের আগে সরকারের কাছে কোনো গোয়েন্দা সতর্কবার্তা ছিল কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। সানচেজ পার্লামেন্টে বলেন, সংকটের ব্যাপ্তি বা সম্ভাব্য মাত্রা আগে থেকে কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা বার্তায় জানানো হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী, স্পেনের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের পাঠানো আগের প্রতিবেদনগুলোতে পরিস্থিতির নিয়মিত বর্ণনা বা সতর্কতার কথা ছিল, কিন্তু এমন ব্যাপক অনুপ্রবেশের পূর্বাভাস ছিল না।
মরক্কোর ভূমিকা নিয়েও স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠেছে। সানচেজ বলেছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনায় মরক্কো সরকার পরিকল্পিতভাবে জড়িত ছিল—এমন ‘শক্ত প্রমাণ’ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে তিনি স্বীকার করেন, সংকটের প্রায় ১০ ঘণ্টার একটি পর্যায়ে মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পরবর্তী সময়ে মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় দ্রুত প্রত্যাবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও তিনি জানান।
অভিবাসীদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও নিজের সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন সানচেজ। তিনি বলেন, স্পেন একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক দেশ; আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে মানুষকে সীমান্তের ওপারে জোর করে ছুড়ে দেওয়া যায় না। তার এই বক্তব্য মূলত বিরোধীদের কঠোর সীমান্তনীতি ও দ্রুত বহিষ্কারের দাবির জবাব হিসেবে এসেছে।
এদিকে সংকটের পর সেউতায় মানবিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার অতিরিক্ত অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। স্পেনের সরকার জানিয়েছে, অভিবাসীদের গ্রহণ, নিবন্ধন ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য অতিরিক্ত ৩ হাজার ৪০০টির বেশি স্থান তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও স্থানীয় পরিষেবা শক্তিশালী করতে সরকারের পক্ষ থেকে সেউতার জন্য ৩০ কোটি ৯০ লাখ ইউরোর সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে।
সেউতা সংকট এখন স্পেনের অভিবাসননীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মরক্কোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা সরকারের প্রস্তুতি ও সংকট মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়ে জবাবদিহি দাবি করছে। অন্যদিকে সানচেজ প্রশাসন বলছে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং মানবিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করেই সংকট মোকাবিলা করা হয়েছে।
সূত্রঃ স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি দপ্তর
এম.কে

