অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। প্রস্তাবিত নতুন আইন অনুযায়ী, অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে গড়ে তোলা পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে মানবাধিকার আইনের সুরক্ষা দাবি করে বহিষ্কার (ডিপোর্টেশন) ঠেকানোর সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বে আনা সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের (ECHR) অনুচ্ছেদ ৮, যা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে, সেটির প্রয়োগে পরিবর্তন আনা হবে। সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অবৈধ অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থী এই বিধান ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে থাকার সময় বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। নতুন পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো সেই সুযোগ সীমিত করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করা।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যখন যুক্তরাজ্যে থাকার বৈধ অধিকার ছাড়াই অবস্থান করছেন, সে সময়ে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পর্ককে সাধারণভাবে বহিষ্কার ঠেকানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, অবৈধভাবে বসবাসের সময় পরিবার গঠন বা সম্পর্ক স্থাপন করলে তা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশে থাকার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না।
তবে যেসব ক্ষেত্রে আবেদনকারী প্রকৃতপক্ষে নিজের সন্তান বা জীবনসঙ্গীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করেন এবং পরিস্থিতি ব্যতিক্রমধর্মী, সেসব ক্ষেত্রে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবে।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, “অভিবাসন ব্যবস্থা না মেনে চলার জন্য কাউকে পুরস্কৃত করা উচিত নয়। এই সংস্কারের মাধ্যমে বৈধ অধিকার ছাড়া অবস্থানকালে গড়ে ওঠা পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হবে। কেবল প্রকৃত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই কার্যকর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের জনস্বার্থকে অতিক্রম করা সম্ভব হবে।”
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হলে অবৈধ অভিবাসীদের দায়ের করা আপিলের মধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ১১ হাজার ৭০০টি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারি নথিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও অনেক ব্যক্তি বৈধ অনুমতি ছাড়াই যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এমনকি একটি সরকারি মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যর্থ আবেদনকারীদের প্রায় ৫৫ শতাংশ দেশ ছেড়ে নাও যেতে পারেন।
এদিকে জিবি নিউজের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শুধু ২০২৫ সালেই ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৮-এর ভিত্তিতে প্রায় ৭৭ হাজার ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। তবে এই পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রস্তাবিত সংস্কারে আশ্রয়প্রার্থীদের আপিল ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আবেদনকারীকে তার সব আইনি যুক্তি একবারেই উপস্থাপন করতে হবে। বারবার নতুন আপিল করে যুক্তরাজ্যে থাকার সময় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত করা হবে। নির্ধারিত সময়ের পরে নতুন আবেদন বা অতিরিক্ত দাবি গ্রহণ করা হবে না।
এছাড়া সরকার অস্থায়ী শরণার্থী মর্যাদা চালুরও প্রস্তাব দিয়েছে। এ ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি নিজ দেশে যুদ্ধ বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাময়িকভাবে আশ্রয় পেলে, পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
প্রস্তাবে মর্ডান স্লেভারি এক্ট-এর অধীনেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়ার দাবি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে সেই দাবি গ্রহণে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিল্প দাবি করেছেন, লেবার সরকারের এই পরিবর্তন যথেষ্ট নয় এবং এতে অবৈধ অভিবাসন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। তার মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদসহ বহিষ্কারে বাধা সৃষ্টি করে এমন আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রস্তাবিত এসব পরিবর্তন কার্যকর করতে আইনটি সংসদে পাস হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। আইনটি কার্যকর হলে যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সংস্কার হিসেবে এটি বিবেচিত হতে পারে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

