TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

অ্যানেস্থেটিস্ট সংকটে যুক্তরাজ্যে বছরে ১৫ লাখ অস্ত্রোপচার বন্ধঃ অপেক্ষায় ৮০ লাখের বেশি রোগী

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অ্যানেস্থেটিস্টের তীব্র সংকটের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডজুড়ে ৮০ লাখের বেশি রোগী দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেরই জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে সময়মতো চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

অ্যানেস্থেসিয়া সেবার ওপর পরিচালিত সবচেয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় ২ হাজার ২৫৬ জন অ্যানেস্থেটিস্ট কম রয়েছে। এই ঘাটতির ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা-প্রক্রিয়া বাতিল বা পিছিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট এনএইচএসের চিকিৎসা-জট কমানোর প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

রয়্যাল কলেজ অব অ্যানেস্থেটিস্টসের ৬৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানেস্থেটিস্টরা অস্ত্রোপচারের আগে, চলাকালে এবং পরে রোগীকে অজ্ঞান রাখা, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অধিকাংশ অস্ত্রোপচার তাদের ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে এই জনবল সংকট সরাসরি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অ্যানেস্থেটিস্টের ঘাটতি ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট জ্যেষ্ঠ পরামর্শক চিকিৎসকদের। মোট ঘাটতির প্রায় ১ হাজার ৬৪০টি পদই এই স্তরের, যা মোট শূন্যপদের ৭৩ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত কর্মচাপ ও মানসিক চাপের কারণে অনেক অ্যানেস্থেটিস্ট চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। তবে সংকটের মূল কারণ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ আসনের অভাব। গত বছর অ্যানেস্থেটিস্ট হওয়ার প্রশিক্ষণে ৬ হাজার ৭৭০ জন আবেদন করলেও সুযোগ পান মাত্র ৫৩৯ জন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অ্যানেস্থেটিস্ট সংকটের কারণে প্রতিবছর মোট ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৮০টি অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। জরিপে অংশ নেওয়া চিকিৎসা-নেতাদের ৮৮ শতাংশ জানিয়েছেন, অ্যানেস্থেটিস্টের অভাবে অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দিতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বলেছেন, এমন ঘটনা প্রতিদিন অথবা প্রতি সপ্তাহেই ঘটছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে রোগীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ৩১ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ৩৬ শতাংশের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। অনেক রোগীর অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে যে তারা কর্মক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছেন। পাশাপাশি দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ও ক্ষতিপূরণের দাবিও বাড়ছে।

রয়্যাল কলেজ অব অ্যানেস্থেটিস্টসের সভাপতি ডা. ক্লেয়ার শ্যানন বলেছেন, রোগীদের এখনও অত্যন্ত দীর্ঘ সময় অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং এর অন্যতম প্রধান কারণ অ্যানেস্থেটিস্টের ঘাটতি। তার মতে, চিকিৎসকের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বাড়ছে। তিনি সরকারের আসন্ন ১০ বছরের জনবল পরিকল্পনায় অ্যানেস্থেটিস্ট প্রশিক্ষণের আসন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

রোগীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের চেয়ার জেনি ওয়েস্টঅ্যাওয়ে বলেছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের এই সংকট রোগীদের জন্য বাস্তব কষ্ট ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা রোগী ও তাদের পরিবারের ওপর শারীরিক এবং মানসিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে এনএইচএসে পূর্ণকালীন সমমানের ১৪ হাজার ৮০০-এর বেশি অ্যানেস্থেটিস্ট কর্মরত রয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ জন বেশি। সরকার আবাসিক চিকিৎসকদের সঙ্গে হওয়া সাম্প্রতিক চুক্তির অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০টি প্রশিক্ষণ আসন তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। তবে এর মধ্যে কতটি আসন অ্যানেস্থেটিস্টদের জন্য বরাদ্দ হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নতুন অ্যানেস্থেটিস্ট তৈরি ও বিদ্যমান দক্ষ চিকিৎসকদের ধরে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এনএইচএসের অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমানো এবং সময়মতো অস্ত্রোপচার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বিলেতে বাড়ি কেনা-বেচাঃ লজার এবং ট্যানেণ্ট

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের একটি অভিবাসন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয়প্রার্থীর মৃত্যু

পূর্ণ ডোজ টিকা প্রাপ্ত ইইউ ও মার্কিন যাত্রীদের যুক্তরাজ্য প্রবেশে কোয়ারেন্টিন লাগবে না