TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পুতিনকে প্রকাশ্যে নরেন্দ্র মোদির চাপ

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে প্রকাশ্যে চাপ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মোদি বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মানবতা ততই পিছিয়ে যাবে। তাই অব্যাহত যুদ্ধের পরিবর্তে শত্রুতা বন্ধ করে শান্তির পথে এগিয়ে যেতে হবে।

পুতিনকে উদ্দেশ করে মোদি বলেন, ভারত ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে সব ধরনের শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন যুদ্ধ চলা মানবতার জন্য এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া; বিপরীতে শান্তির দিকে প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ্ববাসীর জন্য নতুন আশার সৃষ্টি করে।

বৈঠকে মোদি পুতিনকে ‘আমার বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। একই সঙ্গে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তিনি। পুতিনও মোদির বক্তব্যের জবাবে বলেন, শান্তির পথে এগোনোর বিষয়টি নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে রুশ প্রেসিডেন্টের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পরও ক্রেমলিনের অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তনের কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে তারা নিজেদের শর্তের ভিত্তিতে সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত। তবে ইউক্রেন এসব শর্তকে গ্রহণযোগ্য মনে করে না এবং সেগুলোকে কার্যত আত্মসমর্পণের দাবি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বৈঠকে পুতিন মোদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও অবহিত করেন।

এই পরিস্থিতিকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের বিশ্লেষণে পুতিনের ওপর বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক চাপের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। পত্রিকাটির বিশ্ববিষয়ক সম্পাদক স্যাম কিলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকটি শক্তিও এখন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারে। তবে এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে ইউক্রেন বা মানবিক কারণের পাশাপাশি নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও কাজ করতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় শোধনাগারগুলো রাশিয়া থেকে ছাড়মূল্যে কেনা তেল পরিশোধন করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করেছে। ফলে যুদ্ধের মধ্যেও মস্কো ও নয়াদিল্লির মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান শুধু রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই। মোদির প্রকাশ্য বক্তব্যে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে নয়াদিল্লি একদিকে মস্কোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে অন্যদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী বা প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে তার বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। তাদের ইউক্রেন সফরের তারিখ চূড়ান্ত করার কাজ চলছে এবং এই সফরের লক্ষ্য শান্তি প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়া।

এদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়। রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি ও অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাশিয়ার অর্থনীতিতেও যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিত মিলছে। রুশ প্রেসিডেন্টের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক দূত বরিস তিতভ সতর্ক করেছেন, অর্থনীতিকে অতিরিক্ত সামরিক নির্ভরশীল করে ফেললে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সময়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক চাপের কারণে ২০২৬ সালে রাশিয়ার তেল উৎপাদনের পূর্বাভাসও কমানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের বেশি সময় পর রাশিয়ার ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ একসঙ্গে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অংশীদারের কাছ থেকে প্রকাশ্যে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে মোদির আহ্বানের পরও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। বরং রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থানের মৌলিক ব্যবধান, চলমান হামলা এবং ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধের কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো কঠিন। ফলে মোদির প্রকাশ্য বার্তা কতটা বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

বেসামরিক জাহাজে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া, হুঁশিয়ারি যুক্তরাজ্যের

কোমায় আছেন মোজতবা খামেনি— ব্রিটিশ গণমাধ্যমের দাবি

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে ডেমোক্র্যাট শিবিরে কালোমেঘ