17.9 C
London
August 23, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইউরোপের নতুন সীমান্ত ব্যবস্থায় ব্রিটিশদের ভোগান্তিঃ ভুল তথ্য ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ডিজিটাল প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থা—ইইএস—চালুর পর ইউরোপ ভ্রমণকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে ভোগান্তি ও উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘ সারি, যন্ত্রের ত্রুটি, আঙুলের ছাপ নিতে ব্যর্থতা, তথ্যের অসামঞ্জস্য এবং ভিসা নিয়ে বিভ্রান্তির মতো একাধিক সমস্যার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এসব অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।

নতুন ব্যবস্থার আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের নাগরিকদের শেনজেন এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় ডিজিটালভাবে নিবন্ধন করতে হয়। একই সঙ্গে ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। ব্যবস্থাটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ১৮০ দিনের মধ্যে কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত ৯০ দিনের বেশি শেনজেন অঞ্চলে অবস্থান করছেন কি না, তা শনাক্ত করা।

তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই বিভিন্ন বিমানবন্দর ও সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষার ঘটনা সামনে এসেছে। এপ্রিল মাসে পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর কিছু বিমানবন্দরে যাত্রীদের তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ব্যস্ত সময়ে কোথাও কোথাও অপেক্ষার সময় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি বিমানযাত্রায়। দীর্ঘ সীমান্ত সারির কারণে যাত্রীদের কেউ কেউ সংযোগকারী ফ্লাইট মিস করেছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের অপেক্ষায় বিমান ছাড়তে দেরিও হয়েছে। বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা গ্রীষ্মের ব্যস্ত মৌসুমে ব্যবস্থা সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো যাত্রীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত না হওয়া। ব্রিটিশ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মার্টিন ফ্যারেলের দাবি, শেনজেন অঞ্চল থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার পরও ইইএস তার প্রস্থানের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করেনি। ফলে সিস্টেমে তার অবস্থানকাল কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে তাকে কোনো দিন অবশিষ্ট নেই বলেও দেখানো হয়। পরে আবার তার হিসাবে ৩৪ দিন অবশিষ্ট দেখানো হয়। একই ভ্রমণ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে ৯০ দিন অবশিষ্ট দেখানো হচ্ছিল।

এ ধরনের ভুল তথ্য ভবিষ্যতে ব্রিটিশ ভ্রমণকারীদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। কারণ ইইএসের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থানকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা। কোনো ব্যক্তির প্রস্থানের তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত না হলে তাকে ভুলভাবে অতিরিক্ত সময় অবস্থানকারী হিসেবে চিহ্নিত করার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতাও ব্যবস্থাটির দুর্বলতা সামনে এনেছে। নাদিয়া নামের এক ব্রিটিশ যাত্রী জানান, সেখানে দীর্ঘ সারির পাশাপাশি নির্দেশনার ঘাটতি ছিল। কোন সারিতে দাঁড়াতে হবে তা বুঝতে অনেক যাত্রীকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সারির কারণে তার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত আঙুলের ছাপও নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।

বিভিন্ন দেশের সীমান্ত ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একবার নিবন্ধন করার পরও কিছু যাত্রীকে অন্য দেশে গিয়ে আবার একই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে। এর ফলে নতুন ব্যবস্থাটি কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি ভিসাধারীরাও বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। মিউনিখে পড়াশোনা করা এক ব্রিটিশ শিক্ষার্থী জানান, ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেখেই তাকে প্রায়ই ইইএসের সারিতে পাঠানো হতো। পরে তাকে বোঝাতে হতো যে তার দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার্থী ভিসা রয়েছে এবং তিনি সাধারণ পর্যটক নন। তার মতে, কারা ইইএসের আওতায় পড়বেন এবং কারা ছাড় পাবেন, সে বিষয়ে বিমানবন্দরে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

বয়স্ক যাত্রীদের জন্যও ব্যবস্থাটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লানজারোতে ভ্রমণকারী এক ব্রিটিশ দম্পতি জানান, আঙুলের ছাপ নেওয়ার যন্ত্র কাজ না করায় যাত্রীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল। অনেককে বারবার আঙুলের অবস্থান পরিবর্তন করে চেষ্টা করতে হয়েছে। যন্ত্রে কাজ না হলে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার জন্য আলাদা সারিতে দাঁড়াতে হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী মার্টিনও নেদারল্যান্ডসের শিফোল বিমানবন্দরে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। তার মতে, বয়স্ক মানুষের আঙুলের ত্বক শুষ্ক হওয়ায় স্পর্শনির্ভর পর্দা ও আঙুলের ছাপের যন্ত্র ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে। তিনি ব্যবস্থাটির নকশাকেও কম প্রযুক্তি-অভিজ্ঞ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন।

দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় থাকা যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। এড গ্রিফিথস নামের এক ব্রিটিশ যাত্রী জানান, তার দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা থাকা স্ত্রী প্রাগ বিমানবন্দরে যন্ত্রের নির্দেশনা বুঝতে পারেননি। ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের প্রায় এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। পরে তার স্ত্রীকে ছবি না নিয়েই পার করে দেওয়া হয়।

শুধু একবার নয়, বিভিন্ন দেশে একই যাত্রীকে পুনরায় নিবন্ধনের সমস্যাও দেখা গেছে। এডের ক্ষেত্রে প্রাগে নিবন্ধনের পর মিলানে আবার নিবন্ধন করতে হয়েছে। পরে ভিয়েনাতেও আগের নিবন্ধনের তথ্য সিস্টেমে পাওয়া যায়নি। এতে একবার নিবন্ধনের পর ভবিষ্যৎ ভ্রমণ কতটা সহজ হবে—সেই প্রত্যাশা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ইইএস নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। এপ্রিলেই ইউরোপীয় বিমানবন্দরগুলোর সংগঠন জানিয়েছিল, বিভিন্ন দেশে সীমান্তে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিমান সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছিল, দীর্ঘ সারির কারণে যাত্রীদের ফ্লাইট মিস করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

জুলাইয়ে বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা ইউরোপীয় কমিশনের কাছে গ্রীষ্মের ব্যস্ত সময়ে ইইএস পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার সুযোগ চেয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার চেয়ে যাত্রীর সংখ্যা বেশি হলে পুরো প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করার সুযোগ থাকা দরকার।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন থেকে সরে আসেনি। অতিরিক্ত দীর্ঘ সারি তৈরি হলে সীমান্তরক্ষীদের কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ আগামী মাসে শেষ হওয়ার কথা।

ফলে ইউরোপগামী ব্রিটিশ ভ্রমণকারীদের জন্য ইইএস এখন শুধু নতুন একটি সীমান্ত প্রক্রিয়া নয়; এটি সময়, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ প্রবেশাধিকারের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, দীর্ঘমেয়াদি ভিসাধারী এবং সংযোগকারী ফ্লাইটে যাওয়া যাত্রীদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটির দুর্বলতা আরও বড় ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত সময় অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া ইইএস এখন বাস্তবায়নের দক্ষতা নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, দীর্ঘ সারি, অপর্যাপ্ত নির্দেশনা এবং তথ্য সমন্বয়ের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান না হলে ইউরোপের ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুমে ব্রিটিশসহ ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনে আলোচিত ট্রাজেডিঃ তিন শিশুকে হত্যার অভিযোগে ব্রিস্টলের মায়ের বিরুদ্ধে মামলা

রানি হচ্ছেন ক্যামিলা

যুক্তরাজ্যে বন্ধ হতে যাচ্ছে সিগন্যালের কার্যক্রম