17.8 C
London
October 15, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

এআইয়ের ডেটা সেন্টারের জন্য পানির টানঃ তিন মাস ধরে পানি পাচ্ছেন না ইন্দোনেশিয়ার বাসিন্দারা

ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে একের পর এক ডেটা সেন্টার নির্মাণের মধ্যে তীব্র হচ্ছে পানির সংকট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের বাড়িতে কল দিয়ে পানি আসছে না, অথচ ডেটা সেন্টারগুলোতে যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতে পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ সংকটের প্রতিবাদে প্রায় ৩০০ বাসিন্দা খালি প্লাস্টিকের বোতল ও পানির পাত্র নিয়ে নংসা ডিজিটাল পার্কের একটি ডেটা সেন্টার প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন।

বিক্ষোভকারী দেওয়ি সুসান্তি বিবিসিকে বলেন, গত তিন মাস ধরে তাদের বাড়ির কল দিয়ে এক ফোঁটা পানিও আসেনি। তার দাবি, ডেটা সেন্টার নির্মাণের আগে এলাকায় পানির সরবরাহ নির্ভরযোগ্য ছিল। পানির অভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। চাল কেনার জন্য রাখা অর্থ এখন পানির ড্রাম কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে। তার স্বামীকে পানি সংগ্রহের জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতে হয়, এরপর সকালে কাজে যেতে হয়।

বাতামের পানি সরবরাহকারী সংস্থা জানিয়েছে, পানির সরবরাহ উন্নত করতে কাজ চলছে। তবে ডেটা সেন্টারগুলোর চাহিদার কারণে আবাসিক এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সংস্থাটি কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে, দ্বীপটির বাণিজ্য ও শিল্প খাত তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপি বাতাম দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টিকে পানির সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ পানি ডেটা সেন্টারগুলোতে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে সংস্থাটি।

বাতামে পানির সংকট নিয়ে এর আগেও বিক্ষোভ হয়েছে। জলাধারগুলোর পানির স্তর কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। একই সময়ে দ্বীপটিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ চলছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়েছে, মিঠাপানির জন্য জলাধারের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের পানি লবণমুক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখন দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির জন্যও তাদের ডেটা সেন্টারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি পরিচালনায় ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোতে হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে। এসব যন্ত্র অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া ঠেকাতে বিভিন্ন ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এর কিছু ব্যবস্থায় প্রচুর পানি প্রয়োজন হয়। ফলে বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণের সঙ্গে স্থানীয় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাধারণ ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ মার্কিন গ্যালন পানি ব্যবহার হতে পারে। এই পরিমাণ পানি দেশটির প্রায় এক হাজার পরিবারের দৈনিক ব্যবহারের সমান। মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ পরিবারের সমপরিমাণ পানি ব্যবহার হতে পারে। একই ক্ষমতার একটি কেন্দ্রে প্রায় ২২ হাজার বাড়ির সমপরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে।

বাতাম দ্বীপের প্রায় ১৩ লাখ মানুষ বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত ছয়টি কৃত্রিম জলাধারের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস সীমিত হওয়ায় এসব জলাধার দ্বীপটির পানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চলতি বছর পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর পেছনে ঐতিহাসিক মাত্রার ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতির প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন আকার ভূমি ইন্দোনেশিয়ার একটি সিমুলেশন অনুযায়ী, বৃষ্টি না হলে নংসা জলাধার আগামী এক মাসের মধ্যে শুকিয়ে যেতে পারে। এই জলাধার থেকেই দেওয়ি সুসান্তির গ্রাম বাকাউ সেরিপে পানি সরবরাহ করা হয়। জলাধারটির পানির স্তর আরও কমে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাতাম দ্বীপের ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। দ্বীপটির কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ১০টি ডেটা সেন্টার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি নংসা ডিজিটাল পার্কে স্থাপিত হবে। দুটি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে এবং তৃতীয়টির নির্মাণকাজ চলছে। আরও অন্তত ছয়টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন রয়েছে বলে বিপি বাতাম বিবিসিকে জানিয়েছে।

সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি অবস্থান, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলদেশীয় কেব্‌ল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের কারণে বাতাম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফেরিতে সিঙ্গাপুর থেকে দ্বীপটিতে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। ২০১৯ সালে জমি ও জ্বালানিসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে সিঙ্গাপুর ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত করেছিল। ২০২২ সালে দক্ষতাসংক্রান্ত নতুন মানদণ্ড চালুর পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর বিনিয়োগকারীরা বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে শুরু করেন।

নংসা এলাকায় হংকংভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গাও ক্যাপিটাল এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান সিনার প্রিমেরা ১৩ হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে। এপ্রিলে সিঙ্গাপুরের ডেওয়ান একটি ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার সঙ্গে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডেটা সেন্টার নির্মাণের চুক্তি করে। কেন্দ্রটির সক্ষমতা হবে প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট, যা গড়ে প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদার সমান। জুনে ডেওয়ান, চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া ও অস্ট্রেলীয় এআই স্টার্টআপ ফার্মাস ৩৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ‘এআই ফ্যাক্টরি’ নির্মাণের ঘোষণা দেয়।

সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাতাম দ্বীপে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রায় ১০ লাখ বাড়িতে সরবরাহ করা সম্ভব। ফলে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপটির পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বাতামের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যেও ডেটা সেন্টার নির্মাণ দ্রুত বাড়ছে। সেখানে শব্দ, ধুলাবালি, পানির সংকট ও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য কর্তৃপক্ষ ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে।

বাতামের বাসিন্দারা নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে সাধারণ মানুষের পানির প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের উদ্বেগ, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ যেন স্থানীয় মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

সূত্রঃ বিবিসি

এমকে

আরো পড়ুন

বাণিজ্য উত্তেজনা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপে দাম বাড়তে পারে আইফোনের

মিয়ানমারের জান্তামুক্ত এলাকায় ঐক্য সরকারের কার্যক্রম শুরু

ইসরাইলি হামলার নৃশংসতার জেরে তীব্র রক্ত সংকটে গাজা