24.3 C
London
July 5, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ওষুধের সংকটে বিপাকে যুক্তরাজ্যের রোগীরাঃ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতির কারণে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) ব্যবস্থার আওতায় চিকিৎসা নেওয়া হাজারো রোগী চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। ফার্মাসিস্টরা সতর্ক করে বলেছেন, ওষুধ সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা এখন একটি ‘জাতীয় সংকটে’ পরিণত হয়েছে। এর ফলে শুধু রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়ছে না, চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে ব্যাপক চাপ।

কমিউনিটি ফার্মেসি ইংল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি ওষুধের সংকটের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিওন, ইনসুলিন, মনোযোগ ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা (এডিএইচডি) নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচআরটি) এবং উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের সরবরাহে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

সামারসেটের বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী পার্ল বাটলার, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মৃগীরোগে ভুগছেন এবং ২০২৫ সালের মার্চে পারকিনসনস রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন, জানান যে কয়েক সপ্তাহ প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় তার খিঁচুনির মাত্রা এবং শরীর কাঁপার সমস্যা বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ ওষুধ ছাড়া থাকতে হওয়া তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। আবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তাকে সবসময় উদ্বিগ্ন করে রাখে।

অন্যদিকে, উইল্টশায়ারের ক্যালনের বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী কারেন অ্যান্ড্রুজ অগ্ন্যাশয়ের এনজাইম প্রতিস্থাপন ওষুধ ‘ক্রিওন’-এর ওপর নির্ভরশীল। ২০২০ সালে অস্ত্রোপচারের পর থেকে নিয়মিত এই ওষুধ গ্রহণ করলেও গত বছর তিনি দীর্ঘ সময় ওষুধটি সংগ্রহ করতে পারেননি। সম্প্রতি আগের মাত্রার ওষুধ না পাওয়ায় এখন তাকে দিনে তিনটির পরিবর্তে সাতটি ট্যাবলেট খেতে হচ্ছে।

কারেন বলেন, এই পরিস্থিতি তার স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ছাড়া তিনি খাবার হজম করতে পারেন না এবং এতে গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ব্রিস্টলের বেডমিনস্টার ফার্মেসির প্রধান ফার্মাসিস্ট অ্যাডে উইলিয়ামস বলেন, ওষুধের সরবরাহে অনিয়ম এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিটি ফার্মেসিগুলোকে প্রতিদিনই রোগীদের জন্য বিকল্প ওষুধ খুঁজতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

তার মতে, এই সংকট শুধু ফার্মেসির কাজের চাপ বাড়াচ্ছে না, বরং রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থাও কমিয়ে দিচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

রয়্যাল কলেজ অব ফার্মেসির সভাপতি টাসে ওপুতু বলেন, ফার্মাসিস্টরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওষুধ সংগ্রহে ব্যয় করছেন, অথচ সেই সময় রোগীদের চিকিৎসা ও পরামর্শে ব্যবহার করা সম্ভব হতো। তিনি ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি সংকটের সময় নিরাপদভাবে প্রেসক্রিপশনে সীমিত পরিবর্তন আনার ক্ষমতা ফার্মাসিস্টদের দেওয়ার আহ্বান জানান।

চেলটেনহ্যামের সেন্ট জর্জ সার্জারির ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট এমিলি ট্রাসকট বলেন, প্রতি মাসেই ওষুধের প্রাপ্যতায় পরিবর্তন ঘটছে। বিশেষ করে এডিএইচডি ও হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির ওষুধের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অনেক রোগীকেই প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে যেতে হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ (ডিএইচএসসি) জানিয়েছে, ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সরকার দেশীয় ওষুধ উৎপাদন খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে। সরবরাহে বিঘ্ন মোকাবিলায় শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। পাশাপাশি ওষুধের সংকটের সময় কমিউনিটি ফার্মেসিগুলোকে প্রেসক্রিপশনে সীমিত পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ আরও দ্রুত হাতে পাবেন এবং ফার্মেসিগুলোর ওপরও চাপ কমবে।

এদিকে মৃগীরোগবিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘এপিলেপসি অ্যাকশন’ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার মানুষ মৃগীরোগ-সম্পর্কিত কারণে মারা যান। সংস্থাটি রোগীদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে অন্তত দুই সপ্তাহ আগেই প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া এবং ফার্মাসিস্টদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা দ্রুত স্থিতিশীল করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য এবং এনএইচএসের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে প্রাইভেট ফি বর্ধনে ডেন্টাল কেয়ার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ

বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে ভিসা নীতি শিথিল করলো ব্রিটেন

কর্মী অধিকার বিল থেকে সরে গেল লেবার সরকার—ব্যাকবেঞ্চে তীব্র প্রতিক্রিয়া