নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের করা চেক ডিজঅনার মামলায় চেকে উল্লেখিত আর্থিক দায় সম্পূর্ণ পরিশোধ এবং পক্ষগুলোর মধ্যে আপস হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো বা কারাদণ্ড বহাল রাখা সমীচীন নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারাবন্দি রাখা নয়; বরং পাওনা টাকা আদায় নিশ্চিত করা।
বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দায়ের করা একটি ক্রিমিনাল আপিল নিষ্পত্তি করে এই রায় দেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়।
মামলাটি মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য। মামলার নথি অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নার মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ২১ হাজার ৮৭৫ টাকা পরিশোধের পর বাকি ২৮ হাজার ১২৫ টাকার বিপরীতে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন।
২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি চেকটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে জমা দেওয়া হলে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়। পরে আইন অনুযায়ী লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলেও টাকা পরিশোধ না করায় ২০০৯ সালে মামলা করা হয়।
২০১২ সালে মামলাটি বিচারের জন্য সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। আসামি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালত তাকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা জরিমানা করেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবদুল হান্নান মাস্টার হাইকোর্টে ক্রিমিনাল আপিল করেন এবং জামিনের আবেদন জানান। পরে ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্ট তাকে এক বছরের জন্য জামিন দেন।
আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি চেকের অবশিষ্ট অর্থ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন। এ বিষয়ে চলতি বছরের ২১ জুলাই আবদুল হান্নান মাস্টার ও ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের মধ্যে একটি আপসনামা স্বাক্ষরিত হয়।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, মামলার তথ্য ও পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধের মাত্রা এবং আপিলকারী কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয় বিবেচনায় তার দোষী সাব্যস্তকরণ বহাল রাখা হলো। তবে ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা অর্থদণ্ড কমিয়ে চেকে উল্লেখিত ২৮ হাজার ১২৫ টাকার সমপরিমাণ করা হয়েছে।
আদালত আরও জানান, আপিল দায়েরের আগেই আবদুল হান্নান মাস্টার বিচারিক আদালতে ১৪ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অবশিষ্ট অর্থ সরাসরি ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন।
হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট আদালতকে জমা থাকা ১৪ হাজার ১০০ টাকা যথাযথ শনাক্তকরণ সাপেক্ষে দ্রুত ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলায় ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মো. জিসান মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম (রবি)।
ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ বলেন, আদালতের এই রায়ে আইনি সুবিচারের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ হয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাওনা টাকা আদায় করা, কাউকে অহেতুক শাস্তি দেওয়া নয়। আপিলকারী চেকের পুরো অর্থ পরিশোধ এবং আপসনামায় স্বাক্ষর করায় তারা কারাদণ্ড মওকুফের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেন।
তিনি আরও বলেন, আদালত চেকের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড বহাল রেখে আপিলকারীর কারাদণ্ড বাতিল করায় তাদের কোনো আপত্তি ছিল না।
সূত্রঃ চ্যানেল-২৪
এম.কে

