অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত একটি অনানুষ্ঠানিক বলয় বা ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র, সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানভিত্তিক তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিন উপদেষ্টা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সাবেক শিল্প ও গৃহায়ণ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। সমালোচকদের দাবি, এই তিন উপদেষ্টাই ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারক এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল।
অনুসন্ধানী সূত্রগুলোর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই উপদেষ্টা পরিষদের গঠন, প্রশাসনিক নিয়োগ, বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে এই তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে আসিফ নজরুলকে সরকারপ্রধানের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগ রয়েছে, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলা নিষ্পত্তি ও প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল। পাশাপাশি বিচার বিভাগে প্রভাব বিস্তার, বিচারক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বিচারিক রায় বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রবাসীকল্যাণ, জনপ্রশাসন এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে পদায়ন, বদলি ও লাইসেন্স প্রদানকে কেন্দ্র করে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। কয়েকজন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, নতুন লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, পরিবেশ ছাড়পত্র, বন বিভাগের পদায়ন এবং কিছু গবেষণা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, নির্বাচন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষেও এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সংঘটিত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার পেছনে এই তিন উপদেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাদেরকে কেন্দ্র করেই ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ তত্ত্বের জন্ম হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক তিন উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফোনে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ও মূল্যায়ন আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানই হতে পারে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।
সূত্রঃ নিউজ ২৪
এম.কে

