Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

দাসপ্রথায় ক্রাউনের ভূমিকা প্রকাশঃ রাজা চার্লসের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার জোরালো দাবি

নতুন গবেষণায় ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের দীর্ঘদিনের দাস বাণিজ্য সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে আসার পর রাজা চার্লসের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথার জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। এমপি, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ প্রকাশ নয়—প্রাতিষ্ঠানিক দায় স্বীকার ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

 

এই সপ্তাহে প্রকাশিত The Crown’s Silence বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে রানী এলিজাবেথ প্রথম থেকে শুরু করে জর্জ চতুর্থ পর্যন্ত একাধিক ব্রিটিশ রাজা-রানী দাস বাণিজ্যকে ব্যবহার করেছেন ক্রাউনের আয় বাড়াতে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করতে। বইটিতে বলা হয়েছে, শত শত বছর ধরে ব্রিটিশ ক্রাউন ও রয়্যাল নেভি ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক দাস বাণিজ্যকে সুরক্ষা ও সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, ১৮০৭ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ক্রাউন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাস-ক্রেতা। এই বাস্তবতা ব্রিটিশ ইতিহাসের প্রচলিত বয়ানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং রাজতন্ত্রের নৈতিক দায় নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র করেছে।

লেবার পার্টির এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি বলেন, দাসপ্রথার মতো মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে রাজা চার্লসের “ব্যক্তিগত দুঃখ” প্রকাশ যথেষ্ট নয়। তার মতে, বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত অনুশোচনার নয়, বরং রাজতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছে, তার স্বীকৃতি ও জবাবদিহি প্রয়োজন। তিনি আনুষ্ঠানিক ক্ষমার পাশাপাশি দাসপ্রথার দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বর্ণবাদ ও বৈষম্যবিষয়ক গবেষণা সংস্থা রানিমিড ট্রাস্ট জানিয়েছে, রাজা চার্লসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পদক্ষেপ হতে পারে, তবে সেটি তখনই অর্থবহ হবে, যদি এর সঙ্গে দাসপ্রথার উত্তরাধিকার বহনকারী অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের সরকারি অঙ্গীকার থাকে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, ক্ষতিপূরণ মানে সমষ্টিগত অপরাধ চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং ঐতিহাসিক অবিচারের কাঠামোগত প্রভাব দূর করা।

আফ্রিকান ফিউচার্স ল্যাবের পরিচালক লিলিয়ানে উমুবিয়েই বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে দাসপ্রথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। সে কারণে এটি শুধু নৈতিক নয়, বরং আইনগত দায়ও তৈরি করে। তার মতে, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়া প্রকৃত ন্যায়বিচারের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।

গ্রিন পার্টির এমপি কারলা ডেনিয়ার বলেন, দাসদের বংশধরদের প্রতি ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে রাজা চার্লসের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা বহু আগেই হওয়া উচিত ছিল। একই মত দিয়েছেন জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, যারা বলছেন—দাসপ্রথা ও উপনিবেশবাদের প্রভাব আজও পুলিশি সহিংসতা, বিচারব্যবস্থা ও অভিবাসন সংকটে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাইকেল ম্যাকইচারেন বলেন, ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের দাবি কেবল অতীতের জন্য নয়; বরং বৈশ্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য এটি অপরিহার্য। তিনি একে দান নয়, বরং সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।

চলতি বছরের শেষ দিকে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠিতব্য কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে দাসপ্রথার উত্তরাধিকার মোকাবিলায় রাজা চার্লসের ওপর ক্যারিবীয় ও আফ্রিকান দেশগুলোর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিহাসবিদ ব্রুক নিউম্যানের মতে, ২০২৬ সাল রাজা চার্লসের জন্য নীরবতা ভাঙার এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে বাকিংহাম প্যালেসের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *