দিনের আলোয় হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর, দোকানপাটে উপচে পড়া ভিড় আর জমজমাট বাণিজ্য। কিন্তু রাত নামতেই পাল্টে যায় পুরো চিত্র। যৌনকর্মীদের আনাগোনা, মাদকসেবন, অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও অপরাধের কারণে আতঙ্কে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এমনই বাস্তবতা যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরের বহুল পরিচিত সোহো রোড এলাকার।
দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এই সড়কটি এখনো সেই অতীতের ছায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যদিও স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ ও সিটি কাউন্সিল যৌথভাবে এলাকাটিকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
দুপুরে এলাকাটি ঘুরে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে উপচে পড়া ভিড়। এ সময় একদল স্বেচ্ছাসেবক রাস্তা পরিষ্কার, ফুলের গাছে পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার এবং ডাস্টবিন খালি করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাদের লক্ষ্য, বহু বছরের নেতিবাচক ভাবমূর্তি বদলে এলাকাটিকে নতুন রূপ দেওয়া।
কিন্তু মূল সড়ক ছেড়ে পাশের আবাসিক এলাকায় ঢুকতেই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। বাড়ির সামনে ফেলে রাখা পুরোনো আসবাবপত্র, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা, ভাঙা টেলিভিশন, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং নোংরা পরিবেশ এলাকাটির দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, গভীর রাত পর্যন্ত কিছু বাড়িতে অপরিচিত লোকজনের যাতায়াত অব্যাহত থাকে। তার দাবি, এলাকায় যৌনকর্মীদের কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন সকালে বিপজ্জনক বর্জ্য, আবর্জনা ও ফেলে দেওয়া আসবাবপত্র সরাতে হয় তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী ক্যারল বলেন, দিনের বেলায় এলাকায় চলাফেরা স্বাভাবিক থাকলেও রাতের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তার ভাষায়, রাত নামলে রাস্তায় যৌনকর্মীদের দেখা যায় এবং তখন এলাকাটি নিরাপদ মনে হয় না।
আরেক বাসিন্দা টরবাস সিনক্লেয়ার জানান, কয়েক বছর আগে তিনি স্থানীয় একটি দোকানে হামলার শিকার হয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, ভুল পরিচয়ের কারণে ওই হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এরপরও তিনি এলাকায় যাতায়াত করেন, তবে সেই অভিজ্ঞতা এখনো তাকে আতঙ্কিত করে।
স্থানীয়দের অনেকেই জানান, রাতের পর নির্দিষ্ট কিছু সড়ক এড়িয়ে চলেন তারা। তাদের মতে, অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘদিনের সমস্যা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
গত বছর এলাকাটি আবারও আলোচনায় আসে এক নারীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। পুলিশ জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত এক ব্যক্তি যৌনকর্মীদের খুঁজতে ওই এলাকায় এসে পরে এক নারীকে হত্যা করে। এরপর থেকে যৌনকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের শোষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পুলিশ।
সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, আশপাশের এলাকায় সহিংসতা ও যৌন অপরাধ এখনো সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত অপরাধের মধ্যে রয়েছে।
তবে এলাকার ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতারা বলছেন, শুধুমাত্র অপরাধের চিত্র দিয়ে সোহো রোডকে বিচার করা ঠিক হবে না। তাদের দাবি, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুসাংস্কৃতিক বাণিজ্যকেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কেনাকাটা করতে আসেন।
এলাকার ব্যবসায়ী সংগঠনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপক আইশা জুলফকার বলেন, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা টহল, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা যাতে নিরাপদে কেনাকাটা করতে পারেন, সেটিই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
ব্যবসায়ী সংগঠনের সহ-সভাপতি মানি গিল বলেন, অনেকেই মনে করেন এলাকাটি অবনতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য এখনো ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে বিয়ের কেনাকাটা, গয়না, পোশাক এবং খাবারের জন্য আসেন।
তিনি স্বীকার করেন, কিছু অসামাজিক কর্মকাণ্ড এখনো রয়েছে। তবে তার দাবি, দিনের বেলায় এলাকাটি নিরাপদ এবং প্রতিদিন পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কাজ চলছে।
স্থানীয় ধর্মীয় নেতা ও শিক্ষক রাজা জগিরদারও বলেন, সমস্যার পাশাপাশি ইতিবাচক পরিবর্তনও ঘটছে। ব্যবসায়ী, প্রশাসন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা একসঙ্গে কাজ করায় ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিলের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, প্রধান সড়কে সারাদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চললেও পাশের আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে ময়লা ফেলার প্রবণতা এখনো বড় সমস্যা। সাম্প্রতিক বর্জ্য সংগ্রহ–সংক্রান্ত ধর্মঘট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে বিপজ্জনক বর্জ্য দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সোহো রোড যেন দুই ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে জমজমাট ব্যবসা, ক্রেতাদের ভিড় এবং উন্নয়নের চেষ্টা; অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে অপরাধ, মাদক, যৌনকর্মীদের উপস্থিতি এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তাহীনতা। বহু বছরের নেতিবাচক ভাবমূর্তি বদলাতে স্থানীয়দের চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও এলাকাটি পুরোপুরি বদলাতে আরও সময় লাগবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

