যুক্তরাজ্যের নতুন এক সরকারি জরিপে দেশটির মানুষের মধ্যে যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলা, সাইবার হামলা এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ২৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের স্থানীয় এলাকায় যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে। এক বছর আগে একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ১৯ শতাংশ মানুষ।
সরকারি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের এলাকায় যুদ্ধের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি, আর ২১ শতাংশের মতে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ মোট ২৮ শতাংশ মানুষ ২০২৮ সালের মধ্যে নিজেদের এলাকায় যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
সন্ত্রাসী হামলা নিয়েও মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। জরিপে ২৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা ঘটতে পারে। এক বছর আগে এই হার ছিল ২০ শতাংশ। একই সময়ে ৪৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে যুদ্ধ বা সন্ত্রাসের চেয়েও মানুষ সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের। জরিপে প্রায় অর্ধেক মানুষ মনে করেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে ভয়াবহ ঝড় তাদের এলাকায় আঘাত হানতে পারে। তীব্র শীত বা বড় ধরনের শৈত্যপ্রবাহকেও সম্ভাব্য বড় বিপদ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, আগামী এক দশকে বিভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতি ও দুর্যোগের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করেন দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে ভয়াবহ ঝড়, অতিরিক্ত ঠান্ডা, সাইবার হামলা, খাদ্য সরবরাহে সংকট এবং অন্যান্য বড় ধরনের দুর্যোগ।
এই জরিপ পরিচালনার সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও সম্পর্ক রয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। জরিপের বড় একটি অংশ ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিচালিত হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত মানুষের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা থাকলেও নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে আত্মবিশ্বাস কম। জরিপে ৬৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, বড় ধরনের বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশ সামগ্রিকভাবে সম্ভাব্য বিপদের মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত।
অন্যদিকে প্রায় অর্ধেক মানুষ মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতি বা বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের নিজস্ব পরিবার অন্তত মাঝারি পর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে জরুরি পরিস্থিতির আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারের পরামর্শের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, বাড়ি থেকে বের হওয়ার জরুরি পথ আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখা এবং মোবাইল ফোনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা, যাতে জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরের সেবাদানকারীরা তা দেখতে পারেন।
গত গ্রীষ্মে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বহু বছর পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যকে নিজ ভূখণ্ডের ওপর সরাসরি হুমকির সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
সরকারি জরিপে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, বড় ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে সে বিষয়ে সরকারের উচিত সাধারণ মানুষকে আরও তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকেও কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।
প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এমন দুর্যোগের জন্যও আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, যেগুলো বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা খুব কম। তাদের যুক্তি, সম্ভাবনা কম হলেও আগাম প্রস্তুতি থাকলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
সরকার জানিয়েছে, এই জরিপের ফলাফল জরুরি সেবাদানকারী সংস্থা এবং স্থানীয় পরিষদগুলোকে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করবে। সাধারণ মানুষের জন্য দুর্যোগের সময় করণীয় সম্পর্কেও সরকারি নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায় সে বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। আগামী বছরেও সাধারণ মানুষকে আরও প্রস্তুত করার বিষয়ে প্রচার চালানো হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
জরিপটিতে ইংল্যান্ডের ৭ হাজার ৮২ জন, ওয়েলসের ১ হাজার ৪৯ জন, স্কটল্যান্ডের ১ হাজার ৫৭৮ জন এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ১ হাজার ৮২ জন—মোট ১০ হাজার ৭৯১ জন মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ ডেইলি মেইল
এম.কে

