TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বাংলাদেশে এআইনির্ভর ভুয়া খবরের নেটওয়ার্ক শনাক্তঃ লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বাংলা ভাষায় ভুয়া খবর তৈরি ও প্রচারের একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রায় স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে বন্ধ করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির সেপ্টেম্বরের ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে’ এই কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের তদন্ত অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানো এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ভুয়া ও আক্রমণাত্মক কনটেন্ট ছড়ানো। এসব কনটেন্ট তৈরিতে অ্যানথ্রপিকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ক্লড ব্যবহার করা হয়েছে।

তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি পুরো কার্যক্রমটি পরিচালনা করছিলেন। প্ল্যাটফর্মের সীমাবদ্ধতা ও শনাক্তকরণ এড়াতে তিনি প্রায় ১৬ মাসে মোট ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন।

ওই ব্যক্তি ‘ফেইক নিউজ থ্রি ডট পাই’ নামে একটি নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন। সফটওয়্যারটি ক্লডের এপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট কাঠামোয় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কনটেন্ট তৈরি করতে পারত। প্রতিটি ব্যাচে থাকত ১৫টি বাংলা শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত ভুয়া সংবাদ এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি প্রম্পট।

অ্যানথ্রপিকের হিসাবে, এই কার্যক্রমে অন্তত দেড় হাজার শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা ঘটনার বর্ণনা এবং ছবি তৈরির জন্য দেড় হাজার প্রম্পট তৈরি করা হয়েছে। ক্লডে তখনও ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তৈরি করা কনটেন্টগুলোকে অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তরের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এ জন্য আলাদা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হতো। ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেক ভিডিও প্রকাশ এবং আগেই প্রকাশের সময় নির্ধারণ করার ব্যবস্থাও ছিল।

অ্যানথ্রপিক বলছে, ভিডিওগুলো ইউটিউবের পাশাপাশি ফেসবুক লাইভ ও টিকটক লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে প্রচারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কনটেন্টগুলো বিশেষভাবে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের আওয়ামী লীগ সমর্থকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

কার্যক্রমটির পরিচালনাকারী অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে তৈরি কনটেন্টকে নিজেই ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এসব খবরকে ‘গরম ও আক্রমণাত্মক’ করে তোলার পাশাপাশি এমন সহজ ভাষায় লেখার কথা বলা হয়েছিল, যাতে গ্রামের মানুষও সহজে বুঝতে পারে।

নেটওয়ার্কটির তৈরি কনটেন্টে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি—যা বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি নামে পরিচিত—অন্তর্বর্তী সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের লক্ষ্য করা হয়।

এসব কনটেন্টে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তাদের বিরুদ্ধে তালেবানধাঁচের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার মতো অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে। কিছু কনটেন্টে হত্যার ষড়যন্ত্র ও বিশেষ হামলা দল তৈরির মতো কাল্পনিক ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্র নেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করাও এই প্রচারণার অন্যতম কৌশল ছিল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঘিরে আর্থিক দুর্নীতি এবং গোপন রাজনৈতিক জোটের মতো অভিযোগও তৈরি করা হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের তদন্তে নেটওয়ার্কটির কিছু কনটেন্টে ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কথাও উঠে এসেছে।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করার পর এর সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির আশঙ্কা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে একই ধরনের কার্যক্রম আবার শুরু করার চেষ্টা করতে পারেন।

এ কারণে একই ধরনের আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার জন্য নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে একই নেটওয়ার্ক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কার্যক্রম পুনরায় চালানোর চেষ্টা করলে তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করাই এই ব্যবস্থার লক্ষ্য।

অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়নে এই কার্যক্রমকে ‘ক্যাটেগরি থ্রি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর অর্থ, একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক চ্যানেল ও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক কনটেন্ট ছড়ানোর কার্যক্রম চালানো হয়েছিল।

তবে তদন্তে উৎপাদিত সব কনটেন্ট কোন কোন নির্দিষ্ট চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছিল, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে এসব কনটেন্ট ব্যাপকসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল—এমন প্রমাণও অ্যানথ্রপিক পায়নি।

প্রতিবেদনটি এমন একটি সময়ের চিত্র তুলে ধরেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক কনটেন্ট অল্প মানব তদারকিতে তৈরি, সম্পাদনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া এই নেটওয়ার্কে সংবাদ তৈরির পাশাপাশি ছবি, অডিও ও ভিডিও উৎপাদন এবং প্রকাশের প্রক্রিয়াও স্বয়ংক্রিয় করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

সূত্রঃ অ্যানথ্রপিকের সেপ্টেম্বর ২০২৬ ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট’;

এম.কে

আরো পড়ুন

শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালে অবতরণ করলো প্রথম ফ্লাইট

বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে যুগপৎভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র

গান বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে