ব্রিটেনে বছরে ১ লাখ ২৬ হাজার পাউন্ড আয় করেও মাস শেষে ব্যাংক হিসাবে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না বলে জানিয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের ব্যবসায়ী গ্রাহাম রবিনসন। ২০২৬ সালের বাজেটে কর্মী নিয়োগের ব্যয় কমাতে আরও সহায়তা আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়োগকর্তাদের জন্য কর্মসংস্থান ভাতার সীমা ১০ হাজার ৫০০ পাউন্ডে অপরিবর্তিত থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন এই ব্যবসায়ী।
৪৫ বছর বয়সী গ্রাহাম কিসিম নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার হিসাবে, কর দেওয়ার পর মাসে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ পাউন্ড হাতে আসে। কিন্তু মর্টগেজের কিস্তি, কাউন্সিল ট্যাক্স, খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর সেই অর্থ শেষ হয়ে যায়। তার মর্টগেজের মাসিক কিস্তি আগে প্রায় ৯০০ পাউন্ড থাকলেও এখন তা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ পাউন্ড হয়েছে।
গ্রাহামের মতে, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি কর্মীদের জন্য ইতিবাচক হলেও এর বাড়তি ব্যয়ের চাপ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে। বছরে ১ লাখ পাউন্ডের বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় কার্যকর করের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন তিনি। তার হিসাব অনুযায়ী, মাসে অতিরিক্ত ১ হাজার পাউন্ড হাতে পেতে হলে বার্ষিক বেতন প্রায় ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৭ পাউন্ড করতে হবে।
লন্ডনে বসবাসকারী ২৪ বছর বয়সী শেফ লুইয়ের মতে, তার বয়সী অনেকেই বাড়ি কেনার স্বপ্ন ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের নতুন ‘ইওর ফার্স্ট হোম’ প্রকল্পকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য প্রথমবারের ক্রেতারা মাত্র ২.৫ শতাংশ জমা দিয়ে নতুন নির্মিত বাড়ি কেনার সুযোগ পেতে পারেন, যার সঙ্গে সুদমুক্ত ইকুইটি ঋণের সহায়তা থাকবে।
তবে লুইয়ের মতে, কম জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেই বাড়ি কেনা সহজ হবে না। আতিথেয়তা খাতে আয়ের অনিশ্চয়তার কারণে নিয়মিত সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে তার জন্য। তিনি বছরে ৩৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাউন্ড আয় করেন এবং দুই বন্ধুর সঙ্গে তিন শয়নকক্ষের ভাড়া বাড়িতে থাকেন। তার দাবি, আগে আয়ের এক-তৃতীয়াংশ বাড়িভাড়া ও বিলের পেছনে ব্যয় হতো, কিন্তু এখন প্রায় অর্ধেক আয়ই এ খাতে চলে যাচ্ছে। নভেম্বরে তাদের বাড়িভাড়া মাসে আরও ২০০ পাউন্ড বাড়বে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের ৪০ বছর বয়সী হেলেনের পরিবারের মর্টগেজের মাসিক কিস্তি সুদের হার বৃদ্ধির পর ৬০০ পাউন্ডেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে তিনি স্বামী ও আট ও পাঁচ বছর বয়সী দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হিসেবে তিনি যোগাযোগ খাতে কাজ করেন, আর তার স্বামী নিজস্ব স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।
হেলেন শীতকালে নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের জন্য ১০০ পাউন্ড জ্বালানি সহায়তার ঘোষণা স্বাগত জানিয়েছেন। তবে কাউন্সিল ট্যাক্সের ব্যান্ড অনুযায়ী সহায়তা নির্ধারণের পরিবর্তে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার স্বামীর স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটি চার বছরেরও কম সময় আগে চালু হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম, পরিবহন ব্যয় ও নির্মাণ খাতের মন্দার কারণে প্রতিষ্ঠানটি চাপে রয়েছে। আয়করের সীমা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন হেলেন।
ল্যাঙ্কাশায়ারের সাউথ রিবলের ৭২ বছর বয়সী পিটার পিলিঙ্গার গ্যাসের বিল থেকে দৈনিক নির্দিষ্ট চার্জ তুলে দেওয়ার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। বর্তমানে গ্যাস ব্যবহার না করলেও অনেক পরিবারকে এই নির্দিষ্ট চার্জ দিতে হয়। তবে চিকিৎসাজনিত কারণে যাদের বেশি জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, তাদের জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত মেথডিস্ট ধর্মযাজক পিটারের আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে রাষ্ট্রীয় পেনশন থেকে। পাশাপাশি তিনি পেশাগত পেনশন, প্রয়াত স্ত্রীর পেনশনের একটি অংশ এবং স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেবে কাজের ভাতাও পান। রাষ্ট্রীয় পেনশনের পাশাপাশি অন্য আয় থাকা ব্যক্তিদের কর দেওয়ার বিষয়টি সমর্থন করলেও শুধু রাষ্ট্রীয় পেনশনের ওপর নির্ভরশীল মানুষ কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটান, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ওয়েকফিল্ডে ফুলের ব্যবসা করেন ৩৭ বছর বয়সী ড্যানিয়েল ওয়াকার। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় একদিকে ফুল কেনার খরচ, অন্যদিকে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যয় বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকার জ্বালানি শুল্ক বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাতিল করায় স্বস্তি পেলেও আগের মূল্যবৃদ্ধির চাপ এতে কমবে না বলে মনে করেন তিনি।
ড্যানিয়েলের মতে, ফুল বিলাসপণ্য হওয়ায় মানুষের হাতে অর্থ কম থাকলে কেনাকাটার তালিকা থেকে প্রথম দিকেই এটি বাদ পড়ে। বাড়তি পরিবহন ব্যয় ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিলে ব্যবসা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। আবার নিজেরা সেই ব্যয় বহন করলেও লাভ কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর জন্য আরও সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বার্কশায়ারের নিউবেরির ৩৯ বছর বয়সী জনি রবার্টস দুই সন্তানের বাবা। তিনি ম্যাকডোনাল্ডসে খণ্ডকালীন কাজ করার পাশাপাশি টিউশনি করেন এবং অনলাইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা করছেন। দুই কাজ মিলিয়ে প্রায় পূর্ণকালীন সময় কাজ করলেও তার আয় দিয়ে কেবল প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
জনির অভিযোগ, ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের আওতায় বাড়িভাড়ার জন্য যে সহায়তা পাওয়া যায়, তা বাস্তব ভাড়ার তুলনায় কম। তিন শয়নকক্ষের বাসার জন্য নির্ধারিত মাসিক ১ হাজার ২০০ পাউন্ডের সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হলেও তিনি দুই শয়নকক্ষের ফ্ল্যাটের জন্যই মাসে ১ হাজার ৩০০ পাউন্ড ভাড়া দেন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় করলে প্রতি অতিরিক্ত ১ পাউন্ড আয়ের বিপরীতে তার ইউনিভার্সাল ক্রেডিট ৫৫ পেন্স কমে যায়। আয়কর, জাতীয় বিমা ও শিক্ষাঋণের কিস্তি হিসাব করলে অতিরিক্ত কাজ করে হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে বলে জানান তিনি। বাজেটে আরও ২ হাজার স্কুলে বিনা মূল্যে সকালের নাশতা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও দেশের প্রায় ১৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় এই সম্প্রসারণের গতি ধীর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এসব মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বাড়ি কেনার সুযোগ, জ্বালানি সহায়তা ও অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি উচ্চ আবাসন ব্যয়, করের চাপ, ব্যবসা পরিচালনার খরচ এবং সামাজিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ উঠে এসেছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

