TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনের অভিবাসন নিয়মে বড় পরিবর্তনঃ স্পনসর লাইসেন্স ও শিক্ষার্থীদের অর্থের শর্তে নতুন নির্দেশনা

ব্রিটেনে অভিবাসন ও কাজের ভিসাসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি নিয়ম ২০২৬ সালের শেষভাগে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্পনসর লাইসেন্স, দক্ষ কর্মীদের ন্যূনতম বেতন, অস্থায়ী পেশার তালিকা, কেয়ারকর্মীদের নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের ব্যাংক ব্যালান্সের শর্ত নিয়ে নতুন নির্দেশনা ও সময়সীমার কথা সামনে এসেছে। ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি অভিবাসন বুলেটিনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ৩০ অক্টোবরের স্পনসর নিবন্ধনের বরাতে বুলেটিনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ১ লাখ ২৭ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠান কর্মী স্পনসর করার লাইসেন্স পেয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৪৬টি প্রতিষ্ঠানের স্কিলড ওয়ার্কার স্পনসর লাইসেন্স রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলো সরকারি নিবন্ধনের সঙ্গে আলাদাভাবে মিলিয়ে দেখা জরুরি। স্পনসর লাইসেন্স থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠান চাকরির প্রস্তাব দিয়েছে—এমন নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। তাই চাকরি বা স্পনসরশিপের নামে অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় বেতনের শর্তঃ
সাধারণ নিয়মে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার জন্য বার্ষিক ন্যূনতম বেতন ৪১ হাজার ৭০০ পাউন্ড অথবা সংশ্লিষ্ট পেশার নির্ধারিত ‘গোয়িং রেট’—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি পূরণ করতে হয়। ঘণ্টাপ্রতি ১৭.১৩ পাউন্ডের ন্যূনতম হিসাবও প্রযোজ্য হতে পারে। ফলে শুধু বার্ষিক বেতন নির্ধারিত সীমায় থাকলেই সব ক্ষেত্রে যোগ্যতা নিশ্চিত হয় না; পেশাভিত্তিক বেতনের শর্তও পূরণ করতে হয়।
নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কম বেতনের সীমা প্রযোজ্য। নতুন প্রবেশকারী, প্রাসঙ্গিক বিষয়ে পিএইচডি বা স্টেম বিষয়ে পিএইচডিধারীদের জন্য আলাদা ছাড় রয়েছে। তবে ছাড়ের ধরন ও সংশ্লিষ্ট পেশার শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বেতন ভিন্ন হতে পারে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের কিছু পেশায় জাতীয় বেতন কাঠামোর ভিত্তিতেও বেতন নির্ধারিত হয়। তাই সবার জন্য ৩৩ হাজার ৪০০ বা ২৫ হাজার পাউন্ডকে একক বিকল্প বেতনসীমা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
টেম্পোরারি শর্টেজ ও ইমিগ্রেশন স্যালারি লিস্টের মেয়াদঃ
বুলেটিনে বলা হয়েছে, টেম্পোরারি শর্টেজ লিস্ট (টিএসএল) এবং ইমিগ্রেশন স্যালারি লিস্টের (আইএসএল) বর্তমান অন্তর্বর্তী তালিকাগুলোর মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এসব তালিকায় থাকা কিছু পেশা, বিশেষ করে আরকিউএফ ৩ থেকে ৫ স্তরের চাকরি, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার জন্য যোগ্যতা হারাতে পারে—যদি না মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজরি কমিটি পর্যালোচনার পর তালিকা বহাল বা সংশোধনের সুপারিশ করে।
সরকারি নথিতেও ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-কে বর্তমান অন্তর্বর্তী তালিকাগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত সব পেশা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়বে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট পেশাগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পর্যালোচনা ও পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর।
আধুনিক দাসত্বের শিকার কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগঃ
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত ইমিগ্রেশন রুলসের পরিবর্তনসংক্রান্ত এইচসি ৫৮৪-এর অধিকাংশ বিধান ৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, কোনো স্কিলড ওয়ার্কারকে আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে এবং তার পক্ষে চূড়ান্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এলে, তিনি বর্তমান ভিসার মেয়াদ থাকা পর্যন্ত নতুন স্পনসর বা নতুন সার্টিফিকেট অব স্পনসরশিপ ছাড়াই অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন।
তবে এই পরিবর্তনের ফলে ভিসার মেয়াদ বাড়বে না। এটি কেবল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর্মীর কাজের ওপর থাকা স্পনসর-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা শিথিল করে। খেলাধুলাসংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।
১ অক্টোবর থেকে রাইট টু ওয়ার্ক যাচাইয়ে পরিবর্তনঃ
১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ব্রিটেনে কাজের অধিকার যাচাইয়ের নিয়ম প্রচলিত চাকরির সম্পর্কের বাইরেও সম্প্রসারিত হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর্মী, স্বতন্ত্র ঠিকাদার এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নিয়োগদাতা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যাচাইয়ের দায়িত্ব তৈরি হয়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে কাজের অনুমতিহীন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলে এবং যথাযথ যাচাই না করলে জরিমানার পাশাপাশি স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, লাইসেন্স বাতিল হলে সাধারণত অন্তত ১২ মাস নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায় না; কিছু ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।
কেয়ারকর্মীদের জন্য ৬১৩৫ ও ৬১৩৬ কোডের নিয়মঃ
কেয়ার ওয়ার্কার (৬১৩৫) এবং সিনিয়র কেয়ার ওয়ার্কার (৬১৩৬) পদে বিদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের পথ ২২ জুলাই ২০২৫ থেকে বন্ধ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শর্তে যারা ইতোমধ্যে ব্রিটেনে রয়েছেন, তাদের জন্য ২০২৮ সাল পর্যন্ত ভিসা পরিবর্তন বা মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট পেশায় বৈধভাবে কাজ করার শর্তসহ অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। নিয়োগদাতাকে অনুমোদিত স্পনসর হতে হবে এবং কেয়ার খাতের ক্ষেত্রে কেয়ার কোয়ালিটি কমিশনের (সিকিউসি) নিবন্ধনসহ প্রযোজ্য শর্ত মানতে হবে। শুধু ২০২৮ সাল পর্যন্ত সুযোগ রয়েছে বলেই নতুন করে বিদেশ থেকে আবেদন করা যাবে—এমন নয়।
শিক্ষার্থীদের ব্যাংক ব্যালান্সের শর্ত বাড়ছেঃ
বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩০ নভেম্বর ২০২৬ থেকে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনকারীদের জীবনযাত্রার খরচ দেখানোর জন্য আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যাংকে থাকার প্রমাণ দিতে হবে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনে পড়াশোনা করতে হলে প্রতি মাসে ১ হাজার ৫৭০ পাউন্ড হিসাবে নয় মাসের জন্য মোট ১৪ হাজার ১৩০ পাউন্ড দেখাতে হবে। লন্ডনের বাইরে পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ১ হাজার ২০৩ পাউন্ড হিসাবে নয় মাসের জন্য প্রয়োজন হবে ১০ হাজার ৮২৭ পাউন্ড। ৩০ নভেম্বরের আগে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আগের মাসিক হার—লন্ডনে ১ হাজার ৫২৯ পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে ১ হাজার ১৭১ পাউন্ড—প্রযোজ্য থাকবে বলে বুলেটিনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই নতুন অঙ্কগুলো সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে আবেদন করার আগে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। কারণ শিক্ষার্থীর অবস্থান, কোর্সের মেয়াদ এবং অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের তথ্যঃ
বুলেটিনে আরও দাবি করা হয়েছে, ব্রিটেনে ৭ হাজার ৫০০টির বেশি স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, যার মধ্যে কেয়ার খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি। তবে এই নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা ও খাতভিত্তিক হিসাবের সমর্থনে এখানে কোনো পৃথক সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে নিশ্চিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিবাসনসংক্রান্ত এসব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভিসা আবেদনকারী, বর্তমান স্কিলড ওয়ার্কার, কেয়ারকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। স্পনসর লাইসেন্স, বেতনের সীমা, পেশার কোড কিংবা ব্যাংক ব্যালান্সের তথ্য যাচাই না করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেওয়া উচিত নয়।
সূত্রঃ ইউকে.গভ
এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের উঠে যাচ্ছে রাত ১০টার কারফিউও

অনলাইন ডেস্ক

ব্রিটেনে হুহু করে বাড়ছে বাড়ির দাম

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের ডিটেনশন সেন্টারে আশ্রয়প্রার্থীদের বিক্ষোভ