যুক্তরাজ্যে ২০২৬ সালের বাজেট ঘোষণা করেছেন চ্যান্সেলর জন হিলি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঘোষিত এই বাজেটে জ্বালানি ব্যয়ে চাপ কমাতে লাখ লাখ পরিবারের জন্য এককালীন ১০০ পাউন্ড সহায়তা, ব্যাংকের ওপর বাড়তি কর এবং প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের জন্য নতুন সঞ্চয়ী হিসাব চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ব্রিটিশ পরিবারের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি সীমিত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে দেশটির বাজেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (ওবিআর)।
বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হলো, ইংল্যান্ডে কাউন্সিল ট্যাক্সের এ থেকে ডি ব্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলোকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে এককালীন ১০০ পাউন্ড জ্বালানি সহায়তা দেওয়া হবে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় দুই কোটি পরিবার উপকৃত হতে পারে। এ জন্য ২৬০ কোটি পাউন্ডের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্যও অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে সেখানকার সরকারগুলো একই ধরনের সহায়তা দিতে পারে।
এ ছাড়া ঘরোয়া বিদ্যুৎ বিলের ওপর সাময়িকভাবে শূন্য শতাংশে নামানো ভ্যাটের সুবিধা ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর বার্ষিক জ্বালানি মূল্যসীমার হিসাবে একটি পরিবারের প্রায় ৫০ পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে।
জ্বালানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ওবিআরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি গড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী বছর প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির সম্ভাবনাও সীমিত।
অর্থাৎ, পরিবারগুলো কিছু তাৎক্ষণিক সহায়তা পেলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপের কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত বাড়বে না। বাজেট ঘোষণার পেছনে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো স্বল্পমেয়াদে পরিবারগুলোর ব্যয়ের চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
জ্বালানি সহায়তার অর্থ জোগাতে ব্যাংকের ওপর সাময়িকভাবে বাড়তি কর আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন চ্যান্সেলর। ব্যাংক করের সারচার্জ ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করা হবে। এই বাড়তি হার ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া উচ্চ ঝুঁকির মেশিনে বাণিজ্যিক জুয়ার ওপর কর ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। সরকার জানিয়েছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকির জুয়ার কর বাড়িয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রধান সড়কগুলোর জন্য ঘোষিত সহায়তার অর্থ জোগানো হবে।
প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের জন্যও বাজেটে নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৯ সালের এপ্রিল থেকে নতুন ‘ফার্স্ট টাইম বায়ার আইএসএ’ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই হিসাবে বছরে সর্বোচ্চ ৪ হাজার পাউন্ড জমা দেওয়া যাবে এবং যোগ্য বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সরকার সঞ্চয়ের ওপর ২৫ শতাংশ বোনাস দেবে। এই সুবিধা সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড মূল্যের বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে, নগদ সঞ্চয়ের ওপর করমুক্ত ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাব বা ক্যাশ আইএসএর বার্ষিক সীমা ২০ হাজার পাউন্ডই রাখা হয়েছে। আগে এই সীমা কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও নতুন বাজেটে তা কার্যকর করা হচ্ছে না।
বাজেট ঘোষণার পর আগাম সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম আগামী ১২ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ২৮ অক্টোবর বাজেট ঘোষণার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন ডাকবেন না।
প্রধানমন্ত্রী জানান, নিজের দল বা রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে তিনি দেশের মানুষের প্রয়োজন ও তাদের সহায়তার বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের বাজেটে জ্বালানি ব্যয়ে তাৎক্ষণিক সহায়তা, ব্যাংক ও জুয়ার ওপর বাড়তি কর এবং প্রথমবার বাড়ি কেনার জন্য সঞ্চয়ী সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ওবিআরের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপের কারণে ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মানের উন্নতি আগামী দিনগুলোতে সীমিত থাকতে পারে।
সূত্রঃ যুক্তরাজ্যের সরকারি বাজেট নথি, অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

