ব্রিটেনে অনিয়মিত অভিবাসন ও ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ কলামিস্ট ক্যারোল ম্যালোন। এক মতামতধর্মী লেখায় তিনি দাবি করেছেন, অভিবাসীদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কোনো শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার ভাষায়, “একটি শহরকে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য লকডাউন করা গণতন্ত্র নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন।”
ম্যালোনের এই মন্তব্যের পেছনে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি রয়েছে। গত ৪ অক্টোবর হ্যাম্পশায়ারের গসপোর্টে ছোট নৌকায় আসা অভিবাসীদের নিয়ে বিক্ষোভে প্রায় ৩৫০ মানুষ জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশকে আক্রমণ, সংঘর্ষ এবং বর্ণবিদ্বেষমূলক জনশৃঙ্খলা লঙ্ঘনের মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
গসপোর্টে এর আগেও অভিবাসনবিরোধী উত্তেজনা দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসীদের গসপোর্টে নামানো হতে পারে—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ছোট নৌকার যাত্রীরা গসপোর্টে নয়, ডোভারে পৌঁছেছিলেন।
অভিবাসীদের থাকার ব্যবস্থা নিয়েও ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর ও এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পূর্ব সাসেক্সের ক্রোবরোতে ২০২৬ সালের শুরুতে একটি সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ৩০০ জনের বেশি আশ্রয়প্রার্থীকে রাখা হয়। এর পর শহরটিতে অভিবাসনপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী—দুই পক্ষের বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে সাসেক্স পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্প চালুর পর ক্রোবরোতে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ঘটনায় মাত্র তিনটি অভিযোগে চার্জ হয়েছে; এর একটি আশ্রয়প্রার্থীকে এবং দুটি অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারীদের জড়িত থাকার অভিযোগে।
ব্রিটিশ সরকার বলেছে, হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার ব্যয় কমানো এবং স্থানীয় জনগণের ওপর চাপ কমানোর জন্য বড় ও নিয়ন্ত্রিত আবাসনকেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি আশ্রয় হোটেল বন্ধ করে স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড সাশ্রয় হবে।
সংসদে দেওয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ নাগাদ ব্রিটেনে আশ্রয় হোটেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ৪০০ থেকে কমে ১৭০টির নিচে নেমেছিল। একই সময়ে হোটেলে থাকা মানুষের সংখ্যা ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ প্রায় ৫৬ হাজার থেকে কমে প্রায় ২১ হাজারে দাঁড়ায়।
সরকার আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে বৈধভাবে থাকার অধিকার নেই—এমন অভিবাসী ও বিদেশি অপরাধীদের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজারকে ব্রিটেন থেকে সরানো হয়েছে। একই সঙ্গে আশ্রয় হোটেল বন্ধ করে সাবেক সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য বড় স্থাপনা ব্যবহারের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিটেনে অনুমতি ছাড়া অবস্থানের বিভিন্ন কারণ রয়েছে—ভিসা নিয়ে এসে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে যাওয়া, অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, অথবা আশ্রয়ের আবেদন ও আপিল শেষ হওয়ার পরও দেশে অবস্থান করা। সংস্থাটি বলছে, অনুমতি ছাড়া অভিবাসীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন এবং সরকারও ভিসার মেয়াদ পার করে থাকা ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা জানে না।
এদিকে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশের বিষয়টি ঘিরে চলতি বছরও রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ছোট নৌকায় আগমন আগের বছরের তুলনায় কমলেও বিষয়টি নিয়ে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও পাল্টা বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
ফলে ক্যারোল ম্যালোনের মন্তব্য মূলত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সরকারি পদক্ষেপ, পুলিশের জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়ে একটি মতামত।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এমকে

