যুক্তরাজ্যের এক বিশাল অংশের তরুণ-তরুণী কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনে সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির সরকারের চাকরি বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যালান মিলবার্ন।
তিনি বলেছেন, বর্তমানে ব্রিটেনে একটি “উদ্বিগ্ন প্রজন্ম” তৈরি হয়েছে, যারা পুরোনো ধাঁচের কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও নমনীয় কর্মব্যবস্থা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, নচেৎ দেশ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সাবেক লেবার স্বাস্থ্যসচিব অ্যালান মিলবার্ন আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাওয়া এক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরছেন। প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার গত বছরের নভেম্বরে তাকে দায়িত্ব দেন কেন প্রায় ১০ লাখ ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে তা তদন্ত করার জন্য। এই শ্রেণিকে “নিটস” (NEETs – Not in Education, Employment or Training) বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা মানসিক অসুস্থতা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং নিউরোডাইভার্সিটি কর্মহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিলবার্ন মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্মার্টফোননির্ভর জীবনযাপন তরুণদের আচরণ, যোগাযোগ এবং মানসিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থা মানুষকে কর্মহীনতার মধ্যে আটকে রাখছে, কর্মজীবনে প্রবেশে সহায়তা করছে না। আমরা পুরো একটি প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে আছি।”
তিনি আরও বলেন, “এটি একটি ‘বেডরুম প্রজন্ম’। তারা ঘরের মধ্যেই জীবন কাটাচ্ছে। সবসময় অনলাইনে থাকছে, কখনো বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের ঘুমের ধরন, মনোযোগ এবং কাজ করার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”
তবে তরুণদের অলস বা দুর্বল আখ্যা দেওয়ার বিরোধিতা করে মিলবার্ন বলেন, “তারা স্নোফ্লেক নয়। অনেকে বলে এটি নরম প্রজন্ম। আমি তা মনে করি না। এটি আসলে একটি উদ্বিগ্ন প্রজন্ম।”
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ৯ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি তরুণ NEET অবস্থায় রয়েছে। এদের অর্ধেকেরও বেশি কখনো চাকরি করেনি। আবার এক-চতুর্থাংশ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজ করতে অক্ষম হিসেবে বিবেচিত। এদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বলেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাই কাজ করতে না পারার মূল কারণ।
২০১১ সালে এই হার ছিল ২৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাজ্যে কর্মহীন তরুণের সংখ্যা অনেক বেশি। জাপান ও আয়ারল্যান্ডের তুলনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ এবং নেদারল্যান্ডসের তুলনায় তিনগুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অল্প বয়সে দীর্ঘ সময় বেকার থাকা ভবিষ্যৎ আয় ও কর্মজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মিলবার্নের ভাষায়, “তরুণরা খারাপ নয়, অলস নয় বা কম মেধাবীও নয়। তারা এমন এক ডিজিটাল যুগে বড় হয়েছে, যা তাদের যোগাযোগ, সম্পর্ক গঠন এবং মানসিক চাপ সামলানোর ধরন বদলে দিয়েছে।”
তিনি মনে করেন, অভিবাসন কমে যাওয়ার ফলে যে শ্রমিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় এই তরুণদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাজ্যে নেট অভিবাসন নেমে এসেছে ১ লাখ ৭১ হাজারে, যেখানে ২০২২ সালে তা ছিল ৮ লাখ ৯১ হাজার।
এদিকে সাবেক প্রধান শিক্ষক ও টনি ব্লেয়ার এবং কিয়ার স্টারমারের উপদেষ্টা পিটার হাইম্যানও সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির স্কুলগুলো ধীরে ধীরে “কর্মহীনতার পাইপলাইনে” পরিণত হচ্ছে। তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় ধরনের শিক্ষা সংস্কার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

