29.6 C
London
June 27, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তিতে হোম অফিসের ভয়াবহ ব্যর্থতা নিয়ে বিস্ফোরক প্রতিবেদন

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের আশ্রয় আবেদন (অ্যাসাইলাম) নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, দুর্বল নেতৃত্ব এবং নিম্নমানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের চিত্র উঠে এসেছে সীমান্ত ও অভিবাসন বিষয়ক নতুন প্রধান পরিদর্শকের প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার চাপের কারণে ন্যায্যতা ও গুণগত মানকে কার্যত বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে অভিবাসন আপিল ব্যবস্থার ওপর বেড়েছে নজিরবিহীন চাপ।

সাবেক ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস কমিশনার জন টাকেট, যিনি সম্প্রতি সীমান্ত ও অভিবাসন বিষয়ক প্রধান পরিদর্শকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তার প্রতিবেদনে হোম অফিসের আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আশ্রয় আবেদন মূল্যায়নকারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মান অত্যন্ত দুর্বল, কর্মীদের মনোবল তলানিতে এবং পুরো ব্যবস্থার নেতৃত্ব বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে কার্যত অজ্ঞ। তার ভাষায়, হোম অফিসের ভেতরে যেন “সত্যের একাধিক সংস্করণ” বিদ্যমান।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১২ মাসে হোম অফিস দাবি করেছিল যে তাদের ৬২ শতাংশ আশ্রয় সিদ্ধান্ত সন্তোষজনক মানের ছিল। কিন্তু স্বাধীন পরিদর্শকদের মূল্যায়নে সেই হার মাত্র ৫৪ শতাংশ। অথচ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫ শতাংশ, যা বহু বছর ধরেই অর্জিত হয়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে অনুমোদিত আশ্রয় আবেদনগুলোর একটি নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭৯ শতাংশ মামলায় পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এসব সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার গ্রহণ প্রক্রিয়ারও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি, অনুপযুক্ত সাক্ষাৎকার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং আবেদনকারীদের বক্তব্য সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এমনকি কিছু অফিসে অনুমোদনহীন প্রশ্নমালা ব্যবহার এবং কোপাইলট ও চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যারের অনুপযুক্ত ব্যবহারও শনাক্ত হয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সিদ্ধান্তের মান উন্নত করার পরিবর্তে হোম অফিসের ব্যবস্থাপকরা মূল্যায়নের মানদণ্ডই পরিবর্তন করেছেন। আগে যেসব সিদ্ধান্তে গুরুতর ত্রুটি থাকলে তা ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন সেগুলোকেও “ত্রুটিযুক্ত হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এতে নিম্নমানের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন পরিদর্শক।

জরিপে অংশ নেওয়া ৮৪ শতাংশ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গুণগত মানের চেয়ে সিদ্ধান্তের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২০২০ সাল থেকেই উৎপাদনশীলতার কাছে গুণগত মানকে অবহেলা করা হচ্ছে।

নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত জনবল নিয়োগের জন্য যোগ্যতার মান কমিয়ে আনা হয়েছিল এবং নতুন কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়েই দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে। ২০২৩ সালে সাক্ষাৎকারের জন্য দুই ঘণ্টার সীমা নির্ধারণ করায় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি এবং একই আবেদনকারীদের একাধিকবার সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আগের সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল আশ্রয় আবেদনজটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তখন এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি আবেদন ঝুলে ছিল, অথচ অভিবাসন ট্রাইব্যুনাল বছরে মাত্র ২০ হাজার আপিল নিষ্পত্তি করতে সক্ষম ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের বিপুল সংখ্যক প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত দেওয়ায় এখন আপিলের সংখ্যা আরও বেড়েছে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

পরিদর্শকের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, হোম অফিসের বিভিন্ন বিভাগ একে অপরের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় ছাড়াই কাজ করছে। সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেল বন্ধ করা এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য উচ্চমানের আশ্রয় সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছিল না।

প্রতিবেদনের শেষ অংশে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আশ্রয় আবেদনজট কিছুটা কমতে শুরু করায় এখন পুরো ব্যবস্থার সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে প্রথম সাক্ষাৎকার থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় মৌলিক সংস্কার করতে হবে। কারণ দ্রুত কিন্তু অন্যায্য সিদ্ধান্ত কেবল ভবিষ্যতে আরও বড় প্রশাসনিক, আইনি ও মানবিক সংকট তৈরি করে।

সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

ফ্রড বা জালিয়াতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ব্রিটিশ সরকার

পূর্ণ ডোজ টিকা প্রাপ্ত ইইউ ও মার্কিন যাত্রীদের যুক্তরাজ্য প্রবেশে কোয়ারেন্টিন লাগবে না

ব্রিটেনে ড্রাইভিং টেস্ট দালালচক্রঃ প্রশিক্ষকদের লগইন বেচাকেনায় লাখো পাউন্ডের বাণিজ্য