কারাগারে অতিরিক্ত চাপ কমাতে নির্ধারিত সময়ের আগে কিছু বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। তবে আগাম মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের অবাধে চলাফেরার সুযোগ দেওয়া হবে না। তাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ ও নজরদারি থাকবে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীবিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেক্স ডেভিস-জোনস।
মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, “মুক্তি মানেই স্বাধীনতা নয়।” আগাম মুক্তি পাওয়া অপরাধীদের জন্য বিভিন্ন বাধ্যতামূলক শর্ত থাকবে, যাতে তারা সমাজে ফিরে গেলেও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা যায়।
ডমোস্টিক ভায়োলেন্সের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের ক্ষেত্রে জিপিএস ট্র্যাকিং ট্যাগ ব্যবহারের বিধান আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত জানতে পারবে।
এ ছাড়া অপরাধীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রেস্ট্রিকশন জোন চালু করা হবে। অপরাধের ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে কিছু ব্যক্তির ওপর পাব, কনসার্ট ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা এবং বাধ্যতামূলক কর্মসংস্থান বা কাজের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, কারাগারের বাইরে থাকলেও অপরাধীরা যেন নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে থাকে এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।
বর্তমানে ব্রিটেনের পুরুষদের কারাগারগুলো প্রায় ৯৮ শতাংশ ধারণক্ষমতায় রয়েছে। ফলে নতুন বন্দিদের জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কম ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত আগাম মুক্তির ব্যবস্থা কারাগারের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে বলে মনে করছে সরকার।
অ্যালেক্স ডেভিস-জোনস সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কারাগারে জায়গার অভাবে আদালত দোষী সাব্যস্ত গৃহস্থালি নির্যাতনকারীদের কারাদণ্ড দেওয়ার পরও তাদের জেলে পাঠাতে সমস্যায় পড়তে পারে।
তবে সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডোমেস্টিক অ্যাবিউজ কমিশনার ডেম নিকোল জ্যাকবস। তিনি মনে করেন, শুধু সরকারি বিধিনিষেধ যথেষ্ট নয়; নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন, গুরুতর অপরাধীদের আগাম মুক্তির সুযোগ দেওয়া হবে না। খুনি, ধর্ষক, শিশু যৌন অপরাধী এবং শিশুদের গ্রুমিংয়ের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা এই ব্যবস্থার বাইরে থাকবেন।
এর ফলে ২০১৯ সালে পুলিশ কনস্টেবল অ্যান্ড্রু হার্পার হত্যার ঘটনায় অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি আগামী বছর আগাম মুক্তি পাবেন না।
কারাগারের ওপর চাপ কমাতে সরকার বিদেশি নাগরিক অপরাধীদের নিয়েও নতুন ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাজা ঘোষণার পর যত দ্রুত সম্ভব যোগ্য বিদেশি অপরাধীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতে পারে।
বর্তমানে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগারগুলোতে ১০ হাজারের বেশি বিদেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রত্যাবাসন করা গেলে কারাগারের জায়গা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।
ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থায় আরও পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিচারমন্ত্রী অ্যালেক্স নরিস মঙ্গলবার হাউস অব কমন্সে সেন্টেন্সিং অ্যাক্টে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরবেন।
সরকারের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে কারাগারের সীমিত সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা, গুরুতর অপরাধীদের কারাগারে রাখা এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির অপরাধীদের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত ও নজরদারির মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা।
ফলে আগাম মুক্তির এই নীতিতে একদিকে যেমন কারাগারের অতিরিক্ত চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে জিপিএস নজরদারি, চলাচলে বিধিনিষেধ ও কঠোর শর্তের মাধ্যমে জননিরাপত্তা বজায় রাখার ব্যবস্থাও জোরদার করছে ব্রিটিশ সরকার।
সূত্রঃ মিরর.পলিটিক্স
এম.কে

