যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার একযোগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। তরুণদের অসুস্থতাজনিত ভাতা সংস্কারের পরিকল্পনা, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেল বন্ধের উদ্যোগ, কাউন্সিল ট্যাক্সে সম্ভাব্য পরিবর্তন, সামাজিক সেবা সংস্কার এবং জলবায়ু মোকাবিলায় নতুন আবাসন নীতিকে কেন্দ্র করে সরকারকে বিরোধী দল এবং নিজ দলের সংসদ সদস্যদের সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে তরুণদের অসুস্থতাজনিত ভাতা সংস্কারের পরিকল্পনা। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সেবা ও প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে এই ভাতা ব্যবস্থায় কঠোর পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের রেখে যাওয়া বহু বিলিয়ন পাউন্ডের বাজেট ঘাটতি পূরণে আগামী বাজেটে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিকল্পনা সামনে আসতেই লেবার পার্টির ভেতরে নতুন করে বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, স্যার কিয়ার স্টারমারের সময় প্রতিবন্ধী ও অসুস্থতাজনিত ভাতা কমানোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ১৩০ জনের বেশি সংসদ সদস্য অবস্থান নিয়েছিলেন, যার মধ্যে প্রায় ১২০ জনই ছিলেন লেবার দলের এমপি।
তবে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হ্যামিশ ফ্যালকনার মনে করেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। তার দাবি, লেবার সংসদীয় দল বুঝতে পারছে যে বর্তমান ভাতা ব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, অনেক তরুণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে থেকে যাচ্ছেন এবং তাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পার্সোনাল ইন্ডিপেনডেন্স পেমেন্ট বা পিআইপি ব্যবস্থাকেও এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে মানুষ কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে উৎসাহিত হয়।
এদিকে অভিবাসন নীতিতেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ডাউনিং স্ট্রিট। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করার পরিকল্পনা বহাল থাকবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বে অভিবাসন ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আনার যে সংস্কার কার্যক্রম চলছে, তা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে কাউন্সিল ট্যাক্সে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টি অভিযোগ করেছে, লেবার সরকার মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর নতুন করে করের বোঝা চাপানোর পরিকল্পনা করছে। ছায়া আবাসনমন্ত্রী স্যার জেমস ক্লেভারলি বলেন, কাউন্সিল ট্যাক্স ও স্ট্যাম্প ডিউটির পরিবর্তে বাড়ির মূল্যের ওপর নতুন কর আরোপ করা হলে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তার দাবি, কনজারভেটিভ পার্টিই পারিবারিক বাড়ির ওপর কর কমানোর পক্ষে এবং প্রধান আবাসিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি পুরোপুরি বাতিলের নীতিতে অটল।
এদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন নির্মিত সব বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা কার্যকর শীতলীকরণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে। দলটির মতে, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাজ্য চরম গরম মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য ভবিষ্যৎ উপযোগী আবাসন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
অপরদিকে সামাজিক সেবা খাতের সংস্কার নিয়ে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। তবে দলটির নেতা কেমি ব্যাডেনক দুটি শর্ত দিয়েছেন। তার মতে, সংস্কার এমন হতে হবে যাতে সারা জীবন সঞ্চয় করা মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং এর অর্থায়নের জন্য নতুন কর বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
এর পাশাপাশি স্কটিশ লেবারের নেতৃত্বপ্রত্যাশী মনিকা লেনন সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, স্কটিশ লেবারের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী ফলাফলের অন্যতম প্রধান কারণ ছিলেন স্টারমার। তার অভিযোগ, জনগণের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দায়িত্বে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা দলটির ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ফলে ভাতা সংস্কার, করনীতি, অভিবাসন, সামাজিক সেবা এবং জলবায়ু নীতিকে ঘিরে একাধিক বিতর্কের মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সরকারের সামনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরকারের ঘোষিত সংস্কার পরিকল্পনাগুলো প্রকাশিত হলে এসব ইস্যুতে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

