TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ভাড়াটিয়াদের জামানতের লাখ পাউন্ড উধাওয়ের অভিযোগঃ ভয়ংকর কেলেঙ্কারি

যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের একটি ভাড়া-বাড়ি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শতাধিক ভাড়াটিয়ার জামানতের অর্থ ফেরত না দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে পাওয়া ভাড়ার অর্থও যথাসময়ে পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। বিবিসির অনুসন্ধানে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের মিলিয়ে পাওনা অর্থের পরিমাণ কয়েক লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে বলে উঠে এসেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন টনি সিং, যার পূর্ণ নাম আমুন সিং জাজ। তিনি বার্মিংহাম, টেলফোর্ড ও উলভারহ্যাম্পটন এলাকায় শাখা থাকা মরগ্যান, পেইন অ্যান্ড নাইটলি নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। কয়েকটি ঘটনায় পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য তার ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাউন্টি আদালতের রায়ও হয়েছে। বিষয়গুলো ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস কর্তৃপক্ষের কাছেও জানানো হয়েছে।

বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের ব্যক্তিগতভাবে পাওনা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭০০ পাউন্ড থেকে ১৬ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত। একটি পরিবার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি বাড়িতে ভাড়া ছিল। বাড়ি ছেড়ে নিজেদের বাড়ি কেনার পরও তারা ৯০০ পাউন্ডের জামানত ফেরত পায়নি। পরিবারটি পরে জানতে পারে, তাদের জামানতের অর্থ কোনো নিবন্ধিত আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থায় রাখা হয়নি।

রামান কৌর নামের ওই ভাড়াটিয়া বলেন, সংসারের খরচ সামলে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করা অর্থ হওয়ায় ৯০০ পাউন্ড তাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অভিযোগ করেন, টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েস্ট ব্রোমউইচ কার্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ দেখতে পান। এরপর ফোন ও অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি।

শুধু ভাড়াটিয়ারাই নন, বাড়িওয়ালারাও বড় অঙ্কের অর্থ পাওনা থাকার অভিযোগ করেছেন। টেলফোর্ডের চারটি বাড়ির মালিক মাইক হিগওয়ে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে কয়েক মাস তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভাড়ার অর্থ পাননি। পরে তিনি ভাড়াটিয়াদের সরাসরি তাকে অর্থ দেওয়ার অনুরোধ করেন। তার দাবি, প্রায় ১৬ হাজার পাউন্ড এখনো পাওনা রয়েছে।

বিবিসি তিনটি শাখায় আগে কাজ করা ছয়জন সাবেক কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের কয়েকজনের দাবি, তারা টনি সিংকে ভাড়াটিয়াদের জামানত নিয়ম অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানত ব্যবস্থায় জমা রাখতে দেখেননি। একজন সাবেক কর্মী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শত শত ভাড়াটিয়া তাদের জামানতের অর্থ আর নাও পেতে পারেন।

ইংল্যান্ডে ভাড়া ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক সামগ্রিক লাইসেন্স ব্যবস্থা নেই। তবে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নেওয়া জামানত নির্দিষ্ট আইনি শর্ত অনুযায়ী অনুমোদিত আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থায় রাখতে হয়। বিবিসিকে একটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে জামানত সুরক্ষা নিয়ে অনিয়মের ঘটনা তারা শনাক্ত করেছিল।

ওলভারহ্যাম্পটন ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডসও এমন একটি বিষয় শনাক্ত করেছিল বলে বিবিসি জানিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিগুলো অন্য কাউন্সিল এলাকায় হওয়ায় সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। টেলফোর্ড অ্যান্ড রেকিন কাউন্সিল জানিয়েছে, ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডস আইনের অধীনে অপরাধের প্রমাণ তারা পায়নি এবং অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে পরামর্শ দিয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত একটি সম্পত্তিতে গাঁজা চাষের ঘটনাও সামনে এসেছে। এক বাড়িওয়ালার দাবি, ভাড়ার অর্থ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি সম্পত্তিতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পান। পরে জানা যায়, সেখানে গাঁজা চাষ করা হচ্ছিল। বাড়িটির মেরামতে প্রায় ৩২ হাজার পাউন্ড খরচ হয়েছে এবং আরও ১২ হাজার পাউন্ড ভাড়া পাওনা রয়েছে বলে ওই মালিক দাবি করেছেন।

ওই বাড়িওয়ালা আরও অভিযোগ করেন, গ্যাস ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সনদও সম্পন্ন করা হয়নি। বিদ্যুৎ বিলের বড় অঙ্কের টাকা বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক প্রবেশ করে মিটার সরিয়ে নেয় বলেও তিনি জানান।

বিবিসি আরও জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভাড়াটিয়ার জামানত ফেরত না দেওয়া, বাড়িওয়ালাকে ভাড়া না দেওয়া এবং কর্মীদের পাওনা পরিশোধ না করার অভিযোগে অন্তত আটটি কাউন্টি আদালতের রায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। সাবেক কর্মীদের কেউ কেউ বেতন, পেনশন, অসুস্থতাজনিত ছুটি ও মাতৃত্বকালীন পাওনা মিলিয়ে কয়েক দশ হাজার পাউন্ড পাওনা থাকার কথাও জানিয়েছেন।

২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ওয়েস্ট ব্রোমউইচ শাখাকে যুক্তরাজ্যের অর্থপাচারবিরোধী বিধি মেনে চলতে ব্যর্থতার জন্য ২ হাজার ১৫০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও একটি কাউন্টি আদালত রায় দেয় যে স্যান্ডওয়েলের একটি শাখার সাবেক কর্মীকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তাকে ন্যূনতম মজুরি দেওয়া হয়নি। তার কাছ থেকে কর ও জাতীয় বিমার নামে কেটে নেওয়া ১ হাজার ৭২৬ পাউন্ডও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়নি বলে আদালতের ঘটনায় উঠে আসে।

বিবিসি টনি সিংয়ের সঙ্গে ই-মেইল, ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তার বাসা ও কর্মস্থলে চিঠি পৌঁছে দিয়ে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে ভাড়াটিয়াদের যাচাই করত এবং গাঁজা চাষের ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—সেটিও জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

এদিকে মরগ্যান, পেইন অ্যান্ড নাইটলি এখনো ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করছে—এমন প্রমাণও বিবিসি পেয়েছে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে পাওনা ভাড়া ও জামানত ফেরত পেতে বহু বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।

ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের ভাড়া-বাড়ি ব্যবস্থাপনা খাতে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনের রানির গোপন-বিরল প্রতিভা!

যুক্তরাজ্যের সুপারমার্কেট হতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার প্রাদুর্ভাব

যুক্তরাজ্যে ফ্লাইট টিকেট বুকিং চালু করেছে উবার