TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে মানবাধিকার আইনের ফাঁক গলে বহিষ্কার ঠেকাচ্ছেন বিদেশি অপরাধীরা

যুক্তরাজ্যে বহিষ্কারের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে অবাধে বসবাসকারী বিদেশি অপরাধীর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৯ হাজার ৭৭৯ জন বিদেশি অপরাধী বহিষ্কারের অপেক্ষায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। পাঁচ বছর আগে, ২০২০ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে আট হাজার। ফলে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদেশি অপরাধী ও অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে লেবার সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী এক দশকে অতিরিক্ত ৪৫ হাজার বিদেশি অপরাধী ও ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীকে বহিষ্কারের লক্ষ্যে আটক কেন্দ্রের সক্ষমতা ৪০ শতাংশ বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে মানবাধিকার আইনের অপব্যবহার রোধে নতুন আইনও কার্যকর করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বহিষ্কারের জন্য চিহ্নিত হলেও এসব বিদেশি অপরাধী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের একটি বড় অংশ মানবাধিকার আইনের বিভিন্ন বিধান ব্যবহার করে বহিষ্কার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত বা স্থগিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দেড় বছরে বিদেশি অপরাধীদের করা শত শত আপিলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদন সফল হয়েছে। যৌন অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, ডাকাত, প্রতারক, অগ্নিসংযোগকারী এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরাও ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের পারিবারিক জীবনের অধিকারসংক্রান্ত বিধান এবং নিজ দেশে নির্যাতনের আশঙ্কার যুক্তি দেখিয়ে বহিষ্কার ঠেকাতে সক্ষম হয়েছেন।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, মানবাধিকার আইনের ভিত্তিতে আপিল করা বিদেশি অপরাধীদের প্রায় ৪৪ শতাংশই আদালতে সফল হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে আদালত পারিবারিক সম্পর্ক, সন্তানদের স্বার্থ কিংবা স্বজনদের মানসিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্সফোর্ডশায়ারের ক্যাম্পসফিল্ড এবং হ্যাম্পশায়ারের হ্যাসলার অভিবাসন আটক কেন্দ্র ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হবে। এই দুই কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে মোট এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হবে। ফলে সারা দেশে বহিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা বিদেশি অপরাধী ও অবৈধ অভিবাসীদের জন্য মোট আটক সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে তিন হাজার ৪৪০ জনে, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

শুধু অবকাঠামো নয়, অভিবাসন আইনেও বড় পরিবর্তন আনছে সরকার। নতুন আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার সনদের পারিবারিক জীবনের অধিকার ব্যবহার করে বহিষ্কার ঠেকানোর সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হবে। ভবিষ্যতে কেবল নিকটতম পরিবারের সম্পর্কই বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং বিচারকদের ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এছাড়া বর্তমান দুই স্তরের অভিবাসন ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে একক আপিল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং বহিষ্কার সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি আরও দ্রুত হবে বলে সরকারের আশা।

সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন বিধানে একজন আশ্রয়প্রার্থীকে একবারেই তার সব দাবি উপস্থাপন করতে হবে। আপিল ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা বা যুক্তরাজ্যে সন্তান জন্ম নেওয়ার মতো নতুন পরিস্থিতিকে ভিত্তি করে পুনরায় বহিষ্কার ঠেকানোর সুযোগ থাকবে না।

শাবানা মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার নেই—এমন প্রায় ৭০ হাজার ব্যক্তিকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। এদের মধ্যে ১০ হাজার বিদেশি অপরাধী রয়েছেন। তবে সরকার এখানেই থেমে থাকবে না; নতুন বিনিয়োগ ও আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে বহিষ্কারের গতি আরও বাড়ানো হবে।

তিনি জানান, অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত, আটক ও বহিষ্কারের দায়িত্বে থাকা অভিবাসন প্রয়োগ বিভাগের বাজেট আগামী কয়েক বছরে প্রায় দ্বিগুণ করা হবে। একই সঙ্গে কর্মীসংখ্যা ৪ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার ৩০০ জনে উন্নীত করা হবে, যাতে অভিযান, গ্রেপ্তার এবং বহিষ্কার কার্যক্রম আরও জোরদার করা যায়।

তবে সরকারের এই উদ্যোগকে যথেষ্ট মনে করছে না বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি। দলটির ছায়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিল্পের দাবি, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে না এলে বিদেশি অপরাধী ও অবৈধ অভিবাসীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বহিষ্কার করা সম্ভব হবে না। তার ভাষায়, বর্তমান গতিতে বহিষ্কার অব্যাহত থাকলে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে সরাতে কয়েক দশক সময় লেগে যাবে।

বিদেশি অপরাধীদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি, মানবাধিকার আইনের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক এবং বহিষ্কার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার সরকারি উদ্যোগ—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি আবারও দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে ক্যাথরিন ওয়েস্টের আল্টিমেটামঃ সোমবারের মধ্যে স্টারমারকে সরাতে হবে

যুক্তরাজ্যে ১৬ বছর বয়সীদের ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্কঃ নিজ বয়সীদের মধ্যেই অনাগ্রহ ও সংশয়

যুক্তরাজ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার হুমকির মুখে