22.5 C
London
May 31, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে স্কিলড ওয়ার্কার রুটে অনিয়মঃ কর্মীকে কাজ না দেওয়ায় ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

ব্রেক্সিট-পরবর্তী দক্ষ কর্মী ভিসা কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাজ্যে এসে এক বছর ধরে কোনো কাজ না পাওয়ার ঘটনায় এক ভারতীয় নাগরিকের পক্ষে যুগান্তকারী রায় দিয়েছে দেশটির কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনাল। আদালত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ভারতের কেরালা রাজ্যের বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী শাবিন শাজি পরিচর্যা কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য ২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ডে আসেন। স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে—এমন ধারণা থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে একটি গাড়ি কেনেন, অনলাইন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে শাজি জানান, যুক্তরাজ্যে চাকরি পাওয়ার বিষয়ে এক ইউটিউবভিত্তিক পরামর্শদাতার মাধ্যমে কিছু এজেন্টের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। তাদের মাধ্যমে তিনি প্রায় ১৭ হাজার পাউন্ড ব্যয় করেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং তাকে স্পনসরশিপ সনদ দেওয়া হয়, যা তাকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে কাজ ও বসবাসের সুযোগ দেয়।

কিন্তু যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্ট্যাফোর্ডশায়ারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সোয়ান কেয়ার সল্যুশনস তাকে একদিনের জন্যও কোনো শিফট বা কাজ দেয়নি। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

ভিসার শর্ত অনুযায়ী তিনি অন্য প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন কাজও করতে পারেননি। ফলে ধীরে ধীরে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যান। জীবনধারণের জন্য তাকে খাদ্য সহায়তা কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। কখনও শুধু কলের পানি পান করে, কখনও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কাছাকাছি রুটি কিনে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে।

শাজি বলেন, “আমি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলাম। স্থানীয় দোকানে বিনামূল্যে দেওয়া খাবারের খোঁজ করতাম। গির্জায় গেলে মানুষজন আমাকে কিছু খাবার ও চা দিতেন। তাদের সহানুভূতি না পেলে হয়তো টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যেত।”

তিনি আরও বলেন, “আমি ভেবেছিলাম যুক্তরাজ্যে আসা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হবে। কিন্তু এখানে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে মনে হয়েছে আমার বেঁচে থাকা বা মারা যাওয়া নিয়ে কারও কোনো উদ্বেগ নেই।”

পরবর্তীতে কর্মসংস্থান অধিকারবিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘ওয়ার্ক রাইটস সেন্টার’-এর সহায়তায় তিনি মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করে, শাজি কাজ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেছিলেন। কিন্তু নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান তাকে কাজ দেয়নি এবং কোনো বেতনও পরিশোধ করেনি।

বিচারক কেট এডমন্ডস বলেন, “দাবিদার বৈধ অনুমতি নিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন এবং কাজ শুরু করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু নিয়োগদাতা তাকে কাজ দেয়নি। এটি তার বেতন থেকে অননুমোদিতভাবে বঞ্চিত করার শামিল।”

আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে বকেয়া বেতন, ছুটির ভাতা এবং অন্যান্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৮ হাজার ৮৪৩ পাউন্ড ৫৪ পেন্স পরিশোধের নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি মামলা পরিচালনা ব্যয় হিসেবে আরও ৮ হাজার ৭০০ পাউন্ড দিতে বলা হয়।

ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ডোরা-অলিভিয়া ভিকল বলেন, “আমরা এমন বহু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি যেখানে অভিবাসী পরিচর্যা কর্মীদের ব্রিটেনে ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তারা পরিত্যক্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বর্তমান দক্ষ কর্মী ভিসা ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।”

শুনানিতে আরও উঠে আসে, আর্থিক সংকটের কথা জানালে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা শাজিকে নগদভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক কাজ করতে এবং খাদ্য সহায়তা নিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি তাকে বলা হয়েছিল, কাজের জন্য তার ‘পালা’ এলে যোগাযোগ করা হবে।

বিচারক জানান, ২০২৪ সালে সোয়ান কেয়ার সল্যুশনসের স্পনসরশিপ লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দিত না, যা লাইসেন্স বাতিলের অন্যতম কারণ ছিল।

অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এই রায় শুধু শাবিন শাজির ব্যক্তিগত বিজয় নয়; বরং যুক্তরাজ্যে স্পনসরশিপভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আসা হাজারো বিদেশি কর্মীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ইংল্যান্ডে ১৬ বছরের কিশোর-কিশোরীর নিকাহ সম্পন্ন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইমাম দোষী সাব্যস্ত

সহকর্মীকে চুমু খাওয়ার জেরে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে ভিন্ন আবহে ইসলামভীতি সচেতনতা মাস উদযাপন