21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ৯৬ হাজার শূন্যপদঃ তবু চাকরি পাচ্ছেন না বিদেশি কেয়ার কর্মীরা

যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক সামাজিক সেবা খাতে প্রতিদিন প্রায় ৯৬ হাজার পদ খালি থাকলেও নতুন চাকরি ও স্পনসরশিপ পাচ্ছেন না হাজার হাজার বিদেশি কেয়ার কর্মী। সরকারের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়মকারী নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধে স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের অভিযানের ফলে চাকরি হারানো অনেক কর্মীকে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন স্পনসর খুঁজে নিতে, না হলে যুক্তরাজ্য ছাড়তে বলা হচ্ছে।

দ্য আই পেপার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে সরকার ৪ হাজার ৪০৩টি স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করেছে। ব্রেক্সিটের পর কোনো ১২ মাসের সময়কালে এটি সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতের ৮৭২টি লাইসেন্স রয়েছে, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ।

নাইজেরিয়া থেকে ২০২৩ সালের মার্চে যুক্তরাজ্যে আসা ৪৯ বছর বয়সী কেয়ার কর্মী জেরাল্ডিন আদিম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কর্মী সংকট পূরণের উদ্দেশ্যে তৈরি ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসার পরও তিনি নিয়মিত কাজ পাননি। প্রায় এক বছর ধরে নিয়োগদাতা তাকে শিফটের জন্য অপেক্ষা করতে বলার পর জানতে পারেন, বিদেশি কর্মীদের স্পনসর করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স সরকার বাতিল করেছে।

এরপর জেরাল্ডিন আদিমকে ৬০ দিনের মধ্যে নতুন কোনো কেয়ার নিয়োগদাতা খুঁজে নিয়ে স্পনসরশিপ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, নতুন দেশে কাউকে না চিনে এবং কাজের ভিসা নিয়ে আসার পর এমন অনিশ্চয়তায় পড়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। পরে একটি দাতব্য সংস্থার সহায়তায় তিনি নতুন স্পনসর খুঁজে পান।

সরকারের হিসাবে, ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার বিদেশি কেয়ার কর্মী স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের কারণে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তখন পর্যন্ত মাত্র ৪৭০টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাতিলের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

চাকরি হারানো এসব কর্মীকে ‘ডিসপ্লেসড ওয়ার্কার’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ওয়ার্কস রাইট সেন্টার নামের একটি দাতব্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নতুন চাকরি খুঁজছেন এমন কয়েক দশ হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ নতুন পদে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগদাতাদের জন্য স্পনসরশিপের উচ্চ প্রাথমিক খরচ এবং কর্মীদের দক্ষতার সঙ্গে শূন্যপদের সামঞ্জস্যের অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাইজেরিয়ার ৫১ বছর বয়সী আরেক কেয়ার কর্মী জেসমিনের পরিস্থিতিও একই। ২০২৪ সালের মে মাসে তার স্পনসর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর থেকে তিনি নতুন নিয়োগদাতা খুঁজছেন। যুক্তরাজ্যে আসার পর তিনি দেখতে পান, যে প্রতিষ্ঠান তাকে এনেছিল, সেখানে তার জন্য প্রতিশ্রুত কাজ নেই।

জেসমিন জানান, কাজ পাওয়ার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ডেলিভারি ড্রাইভার হিসেবে কাজ করার জন্যও আবেদন করেছিলেন। তিনি হোম অফিসে ফি মওকুফের আবেদন করে যুক্তরাজ্যে থাকার সময় বাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

তার দাবি, এখন কেয়ার হোমগুলোতে চাকরির জন্য আবেদন করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান স্পনসরশিপ দিতে চাইছে না। অনিশ্চিত অভিবাসন পরিস্থিতির কারণে তিনি অনিবন্ধিত কাজের প্রস্তাব এবং ভিসা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ দাবি করার মতো পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হয়েছেন। তার কাছে কাজ ছাড়াই ভিসা করে দেওয়ার জন্য ১৬ হাজার পাউন্ড চাওয়া হয়েছিল বলেও তিনি জানান।

অ্যাকশন ফাউন্ডেশনের কর্মসংস্থান পরামর্শক লুসি ওয়াকার বলেন, নতুন স্পনসর খুঁজতে গিয়ে অনেক ডিসপ্লেসড কেয়ার কর্মী গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়ছেন। এসব কর্মীর সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা ঋণ ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন এবং এর প্রভাব তাদের পরিবারের ওপরও পড়ছে।

স্কিলস ফর কেয়ারের হিসাবে, ইংল্যান্ডের প্রাপ্তবয়স্ক সামাজিক সেবা খাতে যেকোনো সময় প্রায় ৯৬ হাজার শূন্যপদ থাকে। এই খাতে শূন্যপদের হার সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় প্রায় তিন গুণ। সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে খাতটিতে প্রয়োজনীয় কর্মীর সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে ৪ লাখ ১০ হাজারে পৌঁছাবে।

অন্যদিকে গত এক বছরে এই খাতে কাজ করা ব্রিটিশ কর্মীর সংখ্যাও প্রায় ৪০ হাজার কমেছে। বর্তমানে বিদেশি কর্মীরা প্রাপ্তবয়স্ক সামাজিক সেবা খাতের মোট কর্মশক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

সরকার গত বছর নতুন বিদেশি আবেদনকারীদের জন্য কেয়ার কর্মী ভিসার পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে এখন নিয়োগদাতারা মূলত যুক্তরাজ্যে আগে থেকেই অবস্থানরত কর্মীদের নিয়োগ করতে পারছেন। তবে বিভিন্ন ভিসা ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে থাকা কিছু কর্মীকে ২০২৮ সালের জুলাই পর্যন্ত স্পনসর করার সুযোগ রয়েছে।

স্পনসরশিপের খরচও নিয়োগদাতাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোম অফিসের নিবন্ধিত স্পনসর নয়—এমন কোনো কেয়ার প্রতিষ্ঠানের তিন বছরের জন্য একজন কর্মীকে স্পনসর করার লাইসেন্স পেতে প্রায় ৪ হাজার পাউন্ড খরচ হতে পারে। ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই খরচ প্রায় ২ হাজার পাউন্ড। কর্মীকে পরীক্ষামূলকভাবে নিয়োগের আগেই এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়।

নর্থ ইস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ডিরেক্টরস অব অ্যাডাল্ট সোশ্যাল সার্ভিসেসের কর্মী বিষয়ক প্রধান ওয়েন্ডি অ্যাডামস বলেন, এই ব্যয় অনেক নিয়োগদাতার জন্য বহন করা কঠিন। তার মতে, স্পনসরশিপ পাওয়ার আগে ডিসপ্লেসড কর্মীদের বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় নিয়োগদাতারাও কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

ডিসপ্লেসড কর্মীদের নতুন চাকরি খুঁজে দিতে আঞ্চলিক হাবগুলোকে সরকার আগে অর্থায়ন করলেও চলতি বছর সেই অর্থ ৪০ শতাংশ কমিয়ে ৭৫ লাখ পাউন্ড করা হয়েছে। নর্থ ইস্ট অ্যান্ড নর্থ কামব্রিয়া ডিসপ্লেসড ওয়ার্কার্স হাব জানিয়েছে, অর্থ কমে যাওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের স্পনসরশিপের পুরো খরচ বহন করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।

গত সপ্তাহে মন্ত্রীরা আরও ঘোষণা করেছেন, আধুনিক দাসত্বের শিকার ব্যক্তিরা, যাদের মধ্যে কিছু ডিসপ্লেসড কেয়ার কর্মীও থাকতে পারেন, এখন যেকোনো খাতে কাজ করতে পারবেন। তবে অ্যাকশন ফাউন্ডেশনের লুসি ওয়াকার মনে করেন, এতে মূল সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। কারণ এসব কর্মী কেয়ার খাতে কাজ করার জন্যই যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন এবং তারা সেই খাতেই কাজ করতে চান।

সামাজিক সেবা খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ডিসপ্লেসড কর্মীদের সহায়তাকারী হাবগুলোর জন্য আগামী বছরের মার্চের পর অর্থায়ন অব্যাহত থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব কর্মীর সহায়তা কমে গেলে কর্মী সংকটে থাকা কেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও সমস্যায় পড়তে পারে।

স্কটল্যান্ডে ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি নিয়োগদাতাদের স্পনসরশিপ খরচে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ৫ লাখ পাউন্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কেয়ার কর্মীদের ভিসার পথ বন্ধ এবং স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যেই এই অর্থ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এদিকে আদিম নতুন স্পনসর খুঁজে পেলেও তিনি নিয়োগদাতার সঙ্গে কর্মীর ভিসা বেঁধে রাখার বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, খাতভিত্তিক স্পনসরশিপ চালু হলে কেয়ার কর্মীরা ভিসা হারানোর ঝুঁকি ছাড়াই একজন নিয়োগদাতা থেকে অন্য নিয়োগদাতার কাছে যেতে পারবেন।

দ্য আই পেপার জানিয়েছে, এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোম অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে প্রতিবেদনে প্রকাশের সময় পর্যন্ত হোম অফিসের কোনো বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।

সূত্রঃ দ্য আই পেপার

এমকে

আরো পড়ুন

ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের ঘোষণায় যুক্তরাজ্যসহ তিন দেশঃ ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করল ইসরায়েল

আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডা পাঠানোর পরিকল্পনার সমালোচনা করলেন থেরেসা মে

অনলাইন ডেস্ক

ইউজারদের ৫০ পাউন্ড করে দিতে বাধ্য হতে পারে ফেসবুক

অনলাইন ডেস্ক