যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ইরানে টানা নবম রাতের মতো বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তর থেকেই উঠে এসেছে উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা। প্রশাসনের আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি বা সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার অস্ত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রের মজুতও দ্রুত কমে আসছে, যা ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন। এ লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-কে বলেন, নিরাপদভাবে দীর্ঘ সময় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো অস্ত্রভাণ্ডার এখন আর পর্যাপ্ত নেই এবং হোয়াইট হাউস হয়তো পরিস্থিতির প্রকৃত গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করছে না।
সাম্প্রতিক এই হামলাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে আবারও কঠোরভাবে আঘাত করা হয়েছে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, ইরানের হাতে সামরিকভাবে খুব সামান্যই অবশিষ্ট রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলায় ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন স্থাপনাসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এদিকে হামলার জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। কুয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ এনে জানিয়েছে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় সেখানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওমান উপকূলের কাছে একটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা এবং দুটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশের পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে তেল ও গ্যাস পরিবহন সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ‘শাস্তিমূলক অভিযান’ চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কার মধ্যে ইরান অভিযোগ করেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দারখোভিনে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও মার্কিন হামলা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, স্থাপনাটি এখনও নির্মাণাধীন এবং সেখানে কোনো পারমাণবিক উপাদান না থাকায় তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি নেই। সংস্থাটি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে সর্বোচ্চ সামরিক সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়াই নয়, ইরানের ভেতরে সম্ভাব্য স্থল অভিযান পরিচালনার জন্যও যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট আরও বিস্তৃত যুদ্ধে রূপ নিলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

