TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

‘রাশিয়ার আকাশ পুরোপুরি বিপজ্জনক’—বিমান সংস্থাগুলোকে জেলেনস্কির ভয়ংকর সতর্কতা

রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ক্রমেই বাড়তে থাকায় দেশটির আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিমান সংস্থাগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার দাবি, রুশ আকাশসীমা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে বেসামরিক বিমান চলাচলও গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

মঙ্গলবার রাতে দেওয়া ভিডিও ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার আকাশসীমা “সম্পূর্ণ বিপজ্জনক” হয়ে উঠছে। রাশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিমান সংস্থা, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ব্যবহারকারীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

তবে ইউক্রেন বেসামরিক বিমানকে লক্ষ্য করছে না—এমন দাবি করে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন কোনো বেসামরিক উড়োজাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করতে চায় না এবং নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি তাদের উদ্দেশ্য নয়। তার সতর্কতা মূলত রাশিয়ার আকাশে ব্যাপকহারে ড্রোনের উপস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বিমান চলাচলজনিত ঝুঁকি নিয়ে।

বিশেষ করে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় শহরের বিমানবন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি সতর্কতা জারি করেছেন তিনি। ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে এরই মধ্যে রাশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে বারবার বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখতে হয়েছে। মস্কোর চারটি প্রধান বিমানবন্দরও একাধিকবার একই সময়ে কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘কোভিয়র’ বা ‘কার্পেট’ পরিকল্পনার কারণেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। কোনো এলাকায় ড্রোন শনাক্ত হলে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই অঞ্চলে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে কোনো বিমানবন্দর সরাসরি আক্রান্ত না হলেও ড্রোন হামলার কারণে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা আকাশপথ পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিমান চলাচলের ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনসও সতর্ক করেছে যে, ইউক্রেনের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও রাশিয়ার আরও গভীরে হামলা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে এ ধরনের হামলার মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলেও প্রতিষ্ঠানটি মূল্যায়ন করেছে।

এ অবস্থায় ভুল হিসাব, ভুলভাবে লক্ষ্য শনাক্ত করা কিংবা ড্রোন প্রতিহত করার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য এ ধরনের ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

জেলেনস্কির বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জেলেনস্কির বক্তব্যকে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের ঘোষণা” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পুতিন বলেন, ইউক্রেন আলোচনায় ফিরতে চাইছে, কিন্তু তার ভাষায়, “সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় না।”

একই সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন পুতিন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ হামলার তীব্রতা বেড়েছে। মঙ্গলবারের ভারী হামলায় ১২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বুধবার ওডেসা, সুমি ও কিয়েভেও হামলা হয়েছে। রুশ সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে “ব্যাপক” হামলার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনও যুদ্ধকে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে নিয়ে যাওয়ার কৌশল জোরদার করেছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি স্থাপনা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির দুটি বড় অনলাইন খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজোনের ডিপোতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

চীন, তুরস্ক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের বিমান সংস্থা এখনো রুশ আকাশসীমা ব্যবহার করছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই আকাশপথ ব্যবহার করলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হয়। তবে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ বড় বিমান সংস্থা রুশ আকাশসীমা এড়িয়ে চলছে।

বিমান চলাচলে যুদ্ধজনিত ঝুঁকির ভয়াবহতার উদাহরণও রয়েছে সাম্প্রতিক ইতিহাসে। ২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনের আকাশে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এমএইচ১৭ ভূপাতিত হয়ে বিমানে থাকা ২৯৮ জন নিহত হন। গত বছর জাতিসংঘের বেসামরিক বিমান চলাচলবিষয়ক সংস্থা ওই ঘটনায় রাশিয়াকে দায়ী করে। তবে ক্রেমলিন বরাবরই দায় অস্বীকার করে আসছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালে রাশিয়ার আকাশসীমায় একটি বাণিজ্যিক বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন পুতিন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার সময় ওই “মর্মান্তিক ঘটনা” ঘটে। ওই ঘটনায় ৩৮ জন নিহত হন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষেরই আকাশপথে হামলা ও প্রতিরোধমূলক তৎপরতা বাড়ায় বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলা যদি রাশিয়ার আরও গভীরে বিস্তৃত হয়, তাহলে সরাসরি বিমানবন্দর লক্ষ্য না করেও দেশটির আকাশপথে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বিমান সংস্থাগুলোর জন্য রুশ আকাশসীমা ব্যবহার এখন শুধু সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয় নয়; বরং যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি বিবেচনায় এটি একটি বড় নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করলেন ম্যাক্রো

হিজাব পরার পরও যে কারণে গ্রেপ্তার হচ্ছেন আফগান নারীরা

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না সৌদি আরব