তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত সমরাস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক সহায়তার তীব্র সমালোচনা করেছে উত্তর কোরিয়া। ওয়াশিংটনের এ ধরনের নীতি তাইওয়ান প্রণালিতে অপ্রয়োজনীয় সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে অভিযোগ করেছে পিয়ংইয়ং।
বুধবার (৭ অক্টোবর) উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক কিম মিয়ং চোলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তাইওয়ানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের মহড়া উসকানিমূলক এবং ওয়াশিংটনের দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতির বহিঃপ্রকাশ।
যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে কিম মিয়ং চোল বলেন, তাইওয়ানের তথাকথিত নিরাপত্তার স্বার্থে চীনের বিশাল জাতীয় ও সামরিক শক্তির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
সম্প্রতি তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমানের প্রথম চালানের দুটি উন্নত জেট তাইওয়ানের বিমানবহরে যুক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে চুক্তি হওয়া ৬৬টি যুদ্ধবিমানের অংশ হিসেবে এসব বিমান সরবরাহ করা হচ্ছে। এর পরপরই উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী এই কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অবস্থানের প্রতি উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সমর্থন এতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে। অন্যদিকে তাইপেই চীনের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের স্বশাসিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অবস্থান বজায় রেখেছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা ও সামরিক যোগাযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত জুনে পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘এক চীন নীতি’র প্রতি পিয়ংইয়ংয়ের পূর্ণ ও অবিচল সমর্থনের কথা জানান। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন হলেও এ অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। একই সময়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দুই দেশ কূটনীতি, আইন প্রয়োগ এবং সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ‘মূলের চেয়েও মূল জাতীয় স্বার্থ’ হিসেবে বিবেচনা করে। তাইওয়ানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক ও সামরিক যোগাযোগের বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও মার্কিন আইনের আওতায় ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার পাশাপাশি রাশিয়ার প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে উত্তর কোরিয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মদিন উপলক্ষে পাঠানো এক শুভেচ্ছাবার্তায় কিম জং উন বলেন, নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় রাশিয়ার লড়াই চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
২০২৪ সালের জুনে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার উদ্দেশ্যে উত্তর কোরিয়া প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার সেনা পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে একদিকে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অবস্থানের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতির বিরোধিতা, অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন—দুই ক্ষেত্রেই উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্রঃ কেসিএনএ
এমকে

