13.7 C
London
April 22, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের ধাক্কায় ইরানে ২০ লাখ চাকরি হারানোঃ অর্থনীতিতে গভীর সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। ব্যাপক বিমান হামলা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং ইন্টারনেট বন্ধের মতো পদক্ষেপের কারণে দেশজুড়ে নজিরবিহীন হারে চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটছে।

দেশটির উপ-শ্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রী গোলামহোসেইন মোহাম্মাদি জানিয়েছেন, যুদ্ধের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাবে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এই ছাঁটাইয়ের ঢেউ এখন সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

সরকারি ও বেসরকারি মহলে ছাঁটাইকে “শ্রমশক্তির ভারসাম্য রক্ষা” বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে প্রায় সব খাতে। বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানার পাশাপাশি উৎপাদন, খুচরা ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি এবং ডিজিটাল খাতেও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।

রাজধানী তেহরানের জনজীবনেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মেট্রো ও সড়কে যাত্রী কমে যাওয়া, অফিস এলাকায় ফাঁকা পার্কিং—এসবই অর্থনৈতিক স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন নাগরিকরা।

যুদ্ধের কারণে ভোক্তা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মানুষ এখন শুধুমাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় পর্যটন, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য খুচরা খাতে চাহিদা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এদিকে, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইরানের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সরকার নিরাপত্তার কারণ দেখালেও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রায় ৫০ ট্রিলিয়ন রিয়াল ক্ষতি হচ্ছে। সেই হিসাবে, ৫২ দিনের ইন্টারনেট বন্ধে ক্ষতির পরিমাণ ১.৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই পরিস্থিতিতে নারী কর্মীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যুদ্ধের আগেও কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে অংশগ্রহণ ছিল কম, তবে অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তাদের আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে গেছে।

সংবাদমাধ্যম খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। একটি প্রধান শ্রমভিত্তিক সংবাদ সংস্থা তাদের সব সাংবাদিককে ছাঁটাই করে ফ্রিল্যান্স হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।

অন্যদিকে, মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুতে বড় বড় শিল্প স্থাপনায় হামলার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আসালুয়েহ ও মাহশাহরের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা এবং মোবারাকে ও খুজেস্তান স্টিল কারখানায় হামলার ফলে সরাসরি হাজারো শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। পাশাপাশি এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত লাখো মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ইরানের গাড়ি শিল্প, যেখানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কাজ করেন, সেখানেও ছাঁটাইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটায় কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিদেশি সরবরাহকারীরা অনিশ্চয়তার কারণে পণ্য পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, ফলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে পরিস্থিতি উন্নত হলে পুনরায় নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে কর্মীদের ছাঁটাই করছে, আবার কেউ কেউ বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠাচ্ছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরকার ঋণ সহায়তা ঘোষণা করলেও উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই সংকটের মধ্যেই ২০২৬ সালের মার্চে ইরানের মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ অতিক্রম করেছে।

অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কঠোর হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত প্রভাব ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট ডেকে আনতে পারে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

গাজায় দুর্ভিক্ষের আগুন, মায়ের কোলে মৃত্যু হলো ক্ষুধার্ত মেয়ের

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৮০০ জনেরও বেশি ক্রীড়াবিদ নিহত

ইতালিতে অ্যাসাইলাম আবেদনে নতুন আইন, গুনতে হবে ৫ হাজার ইউরো