14.9 C
London
June 2, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

বাতিল অভিবাসী স্থানান্তর প্রকল্পে ব্রিটেনের পক্ষে রায়ঃ রুয়ান্ডার ক্ষতিপূরণ দাবি খারিজ

বিতর্কিত আশ্রয়প্রার্থী স্থানান্তর কর্মসূচি বাতিলের জেরে রুয়ান্ডাকে অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করতে হবে না বলে রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালত এই রায়ে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং রুয়ান্ডার উত্থাপিত আর্থিক দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।

রায়ের ফলে ব্রিটিশ সরকারের জন্য একটি বড় আইনি ও রাজনৈতিক চাপের অবসান ঘটেছে। রুয়ান্ডা অভিযোগ করেছিল, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অভিবাসী স্থানান্তর চুক্তি বাতিল করে যুক্তরাজ্য চুক্তিভঙ্গ করেছে এবং এর ফলে দেশটির উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ সরকার রুয়ান্ডার সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই পরিকল্পনার আওতায় ছোট নৌকা বা অন্যান্য অনিয়মিত পথে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সরকারের দাবি ছিল, এই নীতি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে অবৈধ প্রবেশ নিরুৎসাহিত করবে।

তবে পরিকল্পনাটি শুরু থেকেই আইনি চ্যালেঞ্জ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়ে। পরে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত কর্মসূচিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এসে কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম পূর্ণ কর্মদিবসেই প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা করেন। তিনি এটিকে “মৃত ও সমাহিত” একটি পরিকল্পনা বলে উল্লেখ করেন এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

আদালতে দাখিল করা নথিতে রুয়ান্ডা দাবি করে, চুক্তির আওতায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য নির্ধারিত দুই কিস্তিতে মোট ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড এখনো বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি তারা ৬ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ ও সুদ দাবি করে। বিকল্প হিসেবে আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনাকেও গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।

রুয়ান্ডার বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল ইমানুয়েল উগিরাশেবুজা আদালতে বলেন, এই অংশীদারত্ব বাস্তবায়নের জন্য দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছে। তার অভিযোগ, যুক্তরাজ্য সরকার প্রকল্প বাতিলের আগে রুয়ান্ডাকে যথাযথভাবে অবহিতও করেনি এবং দেশটির নেতারা বিষয়টি প্রথমে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তনের ফলে প্রকল্প বাতিল হওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ ছিল। তারা দাবি করেন, কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের কোনো যৌক্তিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না।

তিন দিনব্যাপী শুনানি শেষে সালিশি ট্রাইব্যুনাল রুয়ান্ডার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। আদালত এক বছরের জন্য দাবি করা ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে এবং দ্বিতীয় বছরের জন্য দাবি করা একই পরিমাণ অর্থ সর্বসম্মতিক্রমে খারিজ করে দেয়।

রায়ের পর যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, সরকার দৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থান উপস্থাপন করেছে এবং ট্রাইব্যুনাল সব বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পক্ষে রায় দিয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি কার্যকর থাকা অবস্থায় মাত্র চারজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় রুয়ান্ডায় গিয়েছিলেন। যদিও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এরই মধ্যে রুয়ান্ডাকে প্রায় ২৯০ মিলিয়ন পাউন্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া কনজারভেটিভ সরকারের সময় পুরো নীতির পেছনে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় লেবার সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও আইনি বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এটি অভিবাসন নীতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজনকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

এদিকে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে আরেকটি ইস্যুতে। প্রতিবেশী কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে এম-২৩ বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ তুলে যুক্তরাজ্য সম্প্রতি রুয়ান্ডার জন্য বরাদ্দ উন্নয়ন সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আদালতের এই রায়ের পরও লন্ডন ও কিগালির মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েন পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবায় বিপর্যয়ঃ অস্ত্রোপচারের পর ভাঙা ছুরি রোগীর শরীরে

যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক দৈন্যতা জনগণকে জুয়া খেলায় ঠেলে দিচ্ছে

যুক্তরাজ্যে প্রতি ৮ জনে ১জন ব্রিটিশ নাগরিক নিচ্ছে প্রাইভেট চিকিৎসাঃ গবেষণা