যুক্তরাজ্যের হিথরো বিমানবন্দরের তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনে নতুন করে তীব্র বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। পূর্ব টুইকেনহামের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ হলে তাদের ওপর দিয়ে আরও বেশি বিমান চলাচল করবে এবং এর ফলে শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও যানজটের মাত্রা বাড়তে পারে।
হিথরো এয়ারপোর্ট লিমিটেড উত্তর-পশ্চিম দিকে নতুন একটি ৩,৫০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে হলে এম২৫ মোটরওয়ের একটি অংশের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে।
প্রস্তাবিত সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের ড্রাফট হিথরো এক্সপ্যানশন ন্যাশনাল পলিসি স্টেটমেন্ট (HENPS) বর্তমানে মতামত ও প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রসারণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান, জলবায়ু সংক্রান্ত আইনগত বাধ্যবাধকতা, বায়ুর মান এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে।
তবে স্থানীয় কাউন্সিল ও এমপিদের একাংশের অভিযোগ, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলো হিথরো সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর সম্ভাব্য বাড়তি শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও যানজট থেকে যথেষ্ট সুরক্ষা দেবে না।
পূর্ব টুইকেনহাম হিথরোর গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলের পথের নিচে অবস্থিত। বিমান পূর্বদিকে উড্ডয়ন করার সময় এলাকাটির বাসিন্দারা বিমানজনিত শব্দের প্রভাব অনুভব করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা স্থানীয় গণতন্ত্র প্রতিবেদকদের জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণ তাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে।
পূর্ব টুইকেনহামে অ্যান্ড মোর স্টোর পরিচালনাকারী ৫১ বছর বয়সী জানিস মেডনিস বলেন, সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয়দের জীবনে আরও শব্দ ও দূষণ যুক্ত হবে। তার আশঙ্কা, এর প্রভাবে এলাকার সম্পত্তির দামও কমে যেতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ অর্থনীতির জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে।
হিথরোর সর্বশেষ জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে পরিচালিত জরিপে টুইকেনহামের ৫৭ শতাংশ বাসিন্দা বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে হিথরো জানিয়েছে।
তবে পূর্ব টুইকেনহামের বাসিন্দা ডগলাস ও ক্লেয়ার প্রস্তাবিত সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, হিথরোর তুলনায় কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত গ্যাটউইক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করা বেশি যৌক্তিক হতে পারে। বিশেষ করে নতুন বিমান চলাচলের পথ কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং তার ফলে স্থানীয়দের ওপর শব্দের প্রভাব কতটা বাড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে তারা উল্লেখ করেন।
গ্যাটউইক বিমানবন্দরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেখানে সম্প্রসারণের অনুমতি দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তর রানওয়ের অবস্থান পরিবর্তন করে সেটিকে নিয়মিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হবে। বর্তমানে উত্তর রানওয়েটি মূল রানওয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হলে জরুরি রানওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ইস্ট টুইকেনহাম হিথরো ক্যাম্পেইনের সদস্য ফিলিপ জেফরি দাবি করেছেন, হিথরোর প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ HENPS-এ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছে না। তিনি পরিকল্পনাটিকে “বায়ুর মান ও পরিবেশের জন্য বিপর্যয়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফিলিপ জেফরির বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণ হলে শব্দদূষণ ও বায়ুর মানের অবনতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার দাবি, এর প্রভাব শুধু পূর্ব টুইকেনহামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; লন্ডনের আরও বিস্তৃত এলাকায় বায়ুর মানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, গত কয়েক বছরে লন্ডনে বায়ুর মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, আকাশে আরও বেশি বিমান চলাচল করলে সেই অগ্রগতি নষ্ট হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে।
টুইকেনহামের এমপি মুনিরা উইলসন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে পাঠানো এক চিঠিতে হিথরো সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, সরকারের আগের হিসাব অনুযায়ী সম্প্রসারণের ফলে যুক্তরাজ্যের জিডিপি ০.৪৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস থাকলেও HENPS-এ সেই পূর্বাভাস কমিয়ে ০.০৫ শতাংশ করা হয়েছে।
মুনিরা উইলসনের দাবি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে কেন্দ্রীভূত হতে পারে এবং এর ফলে দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, HENPS-এর সঙ্গে থাকা টেকসই উন্নয়ন মূল্যায়নে হিথরো সম্প্রসারণের ফলে সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সরকারকে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় সব বাসিন্দা যে সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছেন, তা নয়। পূর্ব টুইকেনহামে ১৩ বছর ধরে বসবাসকারী ৭৯ বছর বয়সী রড পিল বলেছেন, হিথরো সম্প্রসারণ পুরো দেশের জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। তিনি এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন।
রিচমন্ড কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে হিথরোর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে আসছে। সম্প্রতি রিচমন্ড, ওয়ান্ডসওয়ার্থ, কিংস্টন, হিলিংডন, সাউথওয়ার্ক, সাটন এবং উইন্ডসর অ্যান্ড মেইডেনহেড কাউন্সিলের নেতারা যৌথভাবে তৃতীয় রানওয়ের বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডারকে পাঠানো চিঠিতে কাউন্সিল নেতারা বলেছেন, লন্ডনবাসী ও আশপাশের সম্প্রদায়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যখন এখনও এত গভীর এবং অমীমাংসিত, তখন তৃতীয় রানওয়ে প্রয়োজনীয় বা গ্রহণযোগ্য—এমন অবস্থান তারা মেনে নেন না।
কাউন্সিল নেতারা বিকল্প ব্যবস্থাগুলো বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান বিমানবন্দর সক্ষমতার আরও কার্যকর ব্যবহার, উন্নত রেল যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রার পরিবর্তে রেলপথ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
অন্যদিকে হিথরো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
হিথরোর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণ কেবল তখনই বাস্তবায়ন করা হবে যখন শব্দদূষণ, বায়ুর মান ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করেছে, বিমান চলাচলের শব্দের আওতাধীন এলাকা কমানো এবং অপেক্ষাকৃত কম শব্দ ও কম দূষণকারী বিমান ব্যবহারে এয়ারলাইনগুলোকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে।
হিথরো আরও বলেছে, তাদের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সম্প্রসারণের পক্ষে রয়েছে। তাদের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাজারো কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
হিথরো কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের শেষ দিকে তৃতীয় সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত নতুন জনপরামর্শ শুরু করার কথা জানিয়েছে। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের মতামত জানানোর সুযোগ পাবেন।
সরকার জনপরামর্শের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে হিথরো সম্প্রসারণ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বছরের শেষ নাগাদ HENPS নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভোট হতে পারে বলে তথ্যমতে জানা যায়।
সূত্রঃ মাই লন্ডন
এম.কে

