23 C
London
August 11, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনে ‘কবরের জায়গা’ সংকটঃ ২০৪০ সালের মধ্যে ১৭ কাউন্সিলে শেষ হয়ে যাবে দাফনের স্থান

লন্ডনে দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে সমাধিস্থলের জায়গার সংকট। সিটি হলের এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে রাজধানীর ১৭টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এলাকায় দাফনের জন্য আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না। ইতোমধ্যে ক্যামডেন, হ্যাকনি ও টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় নতুন কবরের জন্য জায়গা শেষ হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে লন্ডনের মেয়র সাদিক খানকে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের লন্ডন অ্যাসেম্বলি সদস্য হিনা বোখারি। তার দাবি, সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই কাউন্সিল, কবরস্থান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একসঙ্গে নিয়ে পুরো লন্ডনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

সিটি হলের ‘লন্ডনে সমাধিস্থলের ব্যবস্থা নিরীক্ষা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে মধ্য লন্ডনের বহু বরো ইতোমধ্যে নিজেদের সমাধিস্থলের ধারণক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নিরীক্ষায় সাড়া দেওয়া ২৫টি বরোর মধ্যে ৯টি জানিয়েছে, পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাবে তারা নিজেদের এলাকার বাইরে থাকা কবরস্থানের ওপর নির্ভর করছে।

সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে লন্ডনের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যাকেও দেখা হচ্ছে। জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে লন্ডনের জনসংখ্যার ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ৪০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে দাফনের জায়গার চাহিদা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হিনা বোখারির কাছে বিষয়টি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গেও জড়িত। প্রায় ১৫ বছর আগে নিজের বাবাকে মের্টনের বাড়ির কাছাকাছি দাফন করতে গিয়ে উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেতে তাকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল। তার আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও অনেক পরিবার প্রিয়জনকে নিজেদের বসবাসের এলাকার কাছাকাছি দাফন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

তিনি মনে করেন, ১৫ বছর সময়কে অনেক দীর্ঘ মনে হলেও বাস্তবে তা খুব দ্রুত চলে যাবে। তাই মেয়র সাদিক খানের নেতৃত্বে এখনই একটি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

সমাধানের অংশ হিসেবে লন্ডনের খসড়া নগর পরিকল্পনায় পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি একই জায়গায় একাধিক ব্যক্তিকে দাফনের সুযোগ তৈরি করতে কবর আরও গভীর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সমাধিস্থলের জায়গা তৈরিতে ‘গ্রে বেল্ট’ এবং গ্রিন বেল্ট এলাকার জমি ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে।

তবে গ্রিন বেল্ট ব্যবহারের প্রস্তাবকে অগ্রাধিকার দিতে চান না হিনা বোখারি। তার মতে, প্রথমে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর নিজস্ব জমি, বিদ্যমান কবরস্থানের আশপাশের জায়গা এবং অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব নয়—এমন জমিগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। এরপরও প্রয়োজন থাকলে গ্রিন বেল্ট ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এদিকে হাউস অব লর্ডসে লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের সদস্যরা এমন একটি বিল উত্থাপন করেছেন, যার লক্ষ্য স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে ভবিষ্যতের দাফনের জায়গার চাহিদা আগেভাগে পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ করতে বাধ্য করা। বর্তমানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কবরস্থান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা থাকলেও আইন অনুযায়ী তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ সমাধিস্থলের জায়গা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের জন্য সমাধিস্থলের জায়গা নিশ্চিত করার বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর ফলে জনসংখ্যার পরিবর্তন, স্থানীয় জমির প্রাপ্যতা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগেই পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

লন্ডনের মেয়রের কার্যালয় জানিয়েছে, খসড়া লন্ডন পরিকল্পনায় কাউন্সিলগুলোকে সমাধিস্থলের সম্প্রসারণ, পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি জায়গার ব্যবস্থা নিয়ে সক্রিয় ও সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের প্রয়োজন বিবেচনায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দাফনের জায়গার এই সংকট কেবল জমির সংকট নয়; এর সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক রীতি এবং পরিবারের প্রিয়জনকে কাছাকাছি দাফন করার আকাঙ্ক্ষা সরাসরি জড়িত। বিশেষ করে মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও পৃথক সমাধিস্থলের প্রয়োজন থাকায় ভবিষ্যতে সংকটটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে লন্ডনের সামনে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমাধিস্থলের জায়গা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। ২০৪০ সালের মধ্যে ১৭টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এলাকায় জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস এবং ইতোমধ্যে তিনটি এলাকায় জায়গা না থাকার তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করছে। মেয়র ও কাউন্সিলগুলো এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে কোনো পরিবার প্রিয়জনকে কোথায় দাফন করবে—সেটিই লন্ডনের অন্যতম বড় সামাজিক প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ দ্য স্ট্যান্ডার্ড

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে অনলাইন জালিয়াতি রোধে নতুন আইন করবে পরবর্তী সরকার

ইউকেতে প্যারেন্টাল সুপারভিশনের নতুন টুল নিয়ে এসেছে ইনস্টাগ্রাম

অস্থায়ী মর্যাদায় ফিরছে ব্রিটেনঃ আশ্রয়প্রার্থীদের নীতিতে বড় পরিবর্তন