মধ্যপ্রাচ্যের একসময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো এই সংগঠনটি গভীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন হারানোর কারণে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, সংগঠনটির বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রকাশ্য বিভাজন। ব্রাদারহুডের একটি শিবির লন্ডনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে, আরেকটি শিবিরের অবস্থান তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। নেতৃত্বের বৈধতা, সংগঠনের তহবিলের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছে, যা সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকেও অচল করে তুলেছে।
প্রবীণ নেতাদের এই ক্ষমতার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিকনির্দেশনার অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তরুণ কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ফলে অনেকেই সংগঠন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও বড় সংকট তৈরি করছে।
মুসলিম ব্রাদারহুডের দুর্বলতার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে ২০১৩ সালে মিশরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময়ের পর থেকে সংগঠনটি দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে। বহু শীর্ষ নেতা কারাগারে রয়েছেন, আর অনেকে বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। ফলে মিশরে সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনও ব্রাদারহুডের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। একসময় তুরস্ক ও কাতার সংগঠনটিকে প্রকাশ্য সমর্থন ও নিরাপদ আশ্রয় দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা মিশর ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে ইস্তাম্বুল ও দোহার মতো শহরে নির্বাসিত নেতাদের কার্যক্রমও আগের তুলনায় অনেক বেশি সীমিত হয়ে পড়েছে।
শুধু মিশরেই নয়, উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া ও মরক্কোর মতো দেশগুলোতেও ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক ও আদর্শিক মিত্ররা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি, পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং নতুন প্রজন্মের ভিন্ন রাজনৈতিক প্রত্যাশার কারণে সংগঠনটি সাধারণ মানুষের কাছেও আগের মতো গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারছে না।
দ্য ইকোনমিস্টের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ধারাবাহিক রাজনৈতিক ব্যর্থতা, নেতৃত্বের বিভক্তি এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মুসলিম ব্রাদারহুডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে দাঁড়ানো এই সংগঠন কি নতুন বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব আরও দ্রুত বিলীন হয়ে যাবে।
সূত্রঃ দ্য ইকোনমিস্ট
এম.কে

