TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় খামেনির জানাজাঃ ছিলেন তিন ছেলে, প্রেসিডেন্ট ও স্পিকার

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, রাজধানী তেহরানে প্রায় ২ কোটি এবং দেশজুড়ে মোট সাড়ে ৩ কোটি মানুষ এই শেষযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। এই হিসাব বাস্তবে রূপ নিলে এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় জানাজায় পরিণত হবে।

চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত খামেনির মরদেহকে কেন্দ্র করে ছয় দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে বিশাল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ কোম, ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে।

শুক্রবার থেকেই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় হাজারো শোকাহত মানুষ কফিনের সামনে ভিড় করতে শুরু করেন। কফিনের ওপর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার থেকে আনা লাল পতাকা রাখা হয়েছে, যা শিয়া ঐতিহ্যে শহীদত্ব ও প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

জানাজায় খামেনির পাশাপাশি একই হামলায় নিহত তার পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিনও রাখা হয়েছে। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, খামেনির তিন ছেলে এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি প্রকাশ্যে উপস্থিত হননি।

ইরানজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার অ্যাম্বুলেন্স, ২১টি হেলিকপ্টার, শতাধিক ড্রোন এবং হাজারো উদ্ধারকর্মী। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২০ হাজার শ্রেণিকক্ষ, হাসপাতাল এবং বিপুল পরিমাণ চিকিৎসাসামগ্রী। রাজধানীর বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা, ব্যক্তিগত যান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ৭০০-এর বেশি পার্কিং এলাকা খালি রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

শোকযাত্রীদের জন্য ৫ কোটি রুটি তৈরির পরিকল্পনার পাশাপাশি ১১ হাজারের বেশি বাস, ২৪ ঘণ্টা মেট্রো সেবা এবং অস্থায়ী রান্নাঘরের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

ইরানের দাবি, ৩০টির বেশি দেশের নেতা ও প্রতিনিধিদল এবং ৯০টিরও বেশি দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এই আয়োজনে অংশ নেবেন। পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক, যার মধ্যে ৯০০ জন বিদেশি, পুরো আয়োজন কভার করবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই জানাজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক শক্তি ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এই শোকযাত্রা বিশ্বকে দেখাবে যে ইরান চাপের মুখেও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না।

তবে এই আয়োজন ঘিরে ভিন্নমতও রয়েছে। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন তেহরানবাসী জানিয়েছেন, বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জনসমাগমের কারণে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়েছে এবং অনেকে শহর ছেড়ে চলে গেছেন।

খামেনির শেষযাত্রায় বিপুল জনসমাগমের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তার সমর্থকদের দাবি, কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পশ্চিমা গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে খামেনিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সঙ্গে ভিন্ন একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, যাকে বিশ্বের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরশাসক হিসেবে বর্ণনা করেছে, তার শেষযাত্রায় কোটি মানুষের অংশগ্রহণ সেই প্রচলিত বর্ণনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

সব মিলিয়ে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফন কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে ঘিরে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি বৈঠক, শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে ঐতিহাসিক আলোচনা

বার্সেলোনায় শীর্ষ জনপ্রিয় নাম ‘মোহাম্মদ’

তুরষ্কে পেরেক বিহীন নান্দনিক কাঠের মসজিদ