19.3 C
London
August 29, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশযুক্তরাজ্য (UK)

স্পনসর ছাড়াই যুক্তরাজ্যে যাওয়ার বড় সুযোগঃ মেধাবী গবেষক-প্রযুক্তিবিদদের জন্য নতুন দুয়ার

যুক্তরাজ্যে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন গবেষক, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের আকৃষ্ট করার উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করেছে দেশটির সরকার। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রথমবারের মতো শতাধিক গবেষণানির্ভর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার গবেষণা-ভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে যোগ্য আন্তর্জাতিক গবেষকদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রচলিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজের পথও সম্প্রসারিত হয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্প্রসারণের আওতায় শতাধিক বাণিজ্যিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখন বিদেশি প্রতিভাবান গবেষকদের গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারবে। নতুন তালিকায় ওষুধ, গাড়ি নির্মাণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরমাণু শক্তি, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন এবং অন্যান্য উচ্চ প্রবৃদ্ধির গবেষণামুখী খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

নতুন যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার, আইবিএম, আর্ম, লিওনার্দো ইউকে-সহ বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি অনুমোদিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তালিকাতেও এসব প্রতিষ্ঠানের নাম দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণঃ

বাংলাদেশের যেসব গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্ভাবক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, মানবিক বিদ্যা, সামাজিক বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জীবনবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও নকশা খাতে শক্তিশালী পেশাগত বা গবেষণা-ভিত্তিক অর্জন থাকা ব্যক্তিরা এই পথটি বিবেচনা করতে পারেন। গবেষণা ও একাডেমিক ক্ষেত্রে গ্লোবাল ট্যালেন্ট ব্যবস্থায় বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল, মানবিক বিদ্যা ও সামাজিক বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এটি সাধারণ চাকরির ভিসা নয়। শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া বা চাকরির প্রস্তাব থাকলেই গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা পাওয়া যায় না। আবেদনকারীকে নিজের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভাবান অথবা সম্ভাবনাময় হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়, অথবা নির্দিষ্ট গবেষণা অর্থায়ন ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক থাকতে হয়।

গবেষকদের জন্য নতুন পথ কীভাবে কাজ করবেঃ

যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থা জানিয়েছে, গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার অনুমোদিত অর্থদাতা ব্যবস্থায় এখন শতাধিক গবেষণানির্ভর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কোনো যোগ্য গবেষক অনুমোদিত অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকলে তিনি এই ভিসার গবেষণা পথের যোগ্য হতে পারেন।

এই ব্যবস্থায় গবেষণা অনুদানের মূল্য কমপক্ষে ৩০ হাজার পাউন্ড এবং মেয়াদ কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। আবেদনকারীর চাকরির চুক্তি বা আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদেও কমপক্ষে এক বছর বাকি থাকতে হবে এবং তাকে ওই অর্থায়ন পাওয়া গবেষণা প্রকল্পে অন্তত অর্ধেক সময় কাজ করতে হবে।

গবেষণা অনুদান অনুমোদিত অর্থদাতার তালিকাভুক্ত হতে হবে। অনুদানটি অনুমোদিত তথ্যভান্ডারে থাকলে সেটির সংযোগ দিতে হয়; না থাকলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত অর্থদাতার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দিতে হতে পারে। কর্মস্থল বা আয়োজক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক অথবা সমপর্যায়ের কর্মকর্তার চিঠিও প্রয়োজন হতে পারে।

গবেষণা অনুদান না থাকলেও কি সুযোগ আছেঃ

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গবেষণা অনুদান না থাকলেও পথ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থার পাশাপাশি রয়্যাল সোসাইটি, ব্রিটিশ একাডেমি এবং রয়্যাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে গবেষণা ও একাডেমিক ক্ষেত্রে নেতা বা সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট যোগ্য পদ, প্রতিযোগিতামূলক ফেলোশিপ এবং স্বীকৃত গবেষণা পুরস্কারের ভিত্তিতেও দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।

আর কেউ যদি যুক্তরাজ্য সরকারের নির্ধারিত যোগ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের বিজয়ী হন, তাহলে সাধারণ অনুমোদন ধাপ এড়িয়ে সরাসরি ভিসার জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে পুরস্কারটি অবশ্যই সরকারি তালিকায় থাকা যোগ্য পুরস্কার হতে হবে এবং আবেদনকারীকে ওই পুরস্কারের নামধারী বিজয়ী হতে হবে।

প্রযুক্তিবিদদের জন্যও সুযোগঃ

গবেষণার বাইরে ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতেও গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার সুযোগ রয়েছে। আর্থিক প্রযুক্তি, খেলাধুলাভিত্তিক প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে নেতা বা সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে যোগ্য ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও চাকরির ন্যূনতম বেতন বা ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা ভিসা পাওয়ার পূর্বশর্ত নয়।

২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নকশা শিল্পের জন্যও গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসায় পৃথক পথ যুক্ত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত বা সম্ভাবনাময় যোগ্য নকশাবিদদের জন্যও এই ভিসার আওতায় যুক্তরাজ্যে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভিসা পেলে কী কী করা যায়ঃ

গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর কাজের স্বাধীনতা। ভিসাধারী চাকরিজীবী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি স্বনিযুক্ত পেশাজীবী হতে পারেন এবং নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকও হতে পারেন। চাকরি পরিবর্তন বা কাজ বন্ধ করার জন্য সাধারণভাবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ভিসা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত নেওয়া যায় এবং যোগ্যতা বজায় থাকলে পরে তা নবায়ন করা যায়।

যোগ্য আবেদনকারী স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের নির্ভরশীল সদস্য হিসেবে সঙ্গে নিতে পারেন। নির্ভরশীল স্বামী বা স্ত্রী কাজ ও পড়াশোনা করতে পারেন, যদিও সরকারি অর্থসহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।

স্থায়ী বসবাসের সুযোগঃ

বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা। গ্লোবাল ট্যালেন্ট ব্যবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট অনুমোদন বা অসাধারণ প্রতিভার ভিত্তিতে আবেদনকারীরা যুক্তরাজ্যে ধারাবাহিকভাবে তিন বছর থাকার পর স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারেন। সম্ভাবনাময় প্রতিভার কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময় পাঁচ বছর।

তবে স্থায়ী বসবাসের সময় ইংরেজি ভাষা ও যুক্তরাজ্যের জীবনযাপন সম্পর্কে জ্ঞানের পরীক্ষাসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। বর্তমানে নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে করা আবেদনে ভাষার ন্যূনতম মান বি-১ এবং ২০২৭ সালের ২৬ মার্চ বা তার পরের আবেদনের ক্ষেত্রে বি-২ মান নির্ধারিত রয়েছে, যদি কোনো ছাড় প্রযোজ্য না হয়।

আবেদন করতে কত খরচঃ

বর্তমান সরকারি ফি অনুযায়ী গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার মূল আবেদন ফি ৭৬৬ পাউন্ড। অনুমোদনপত্র প্রয়োজন হলে প্রথম ধাপে ৫৬১ পাউন্ড এবং ভিসার ধাপে আরও ২০৫ পাউন্ড দিতে হয়। যোগ্য পুরস্কারের ভিত্তিতে সরাসরি আবেদন করলে ৭৬৬ পাউন্ড একসঙ্গে দিতে হয়। নির্ভরশীল প্রত্যেক সদস্যের ক্ষেত্রেও ৭৬৬ পাউন্ড ভিসা ফি প্রযোজ্য।

এর পাশাপাশি প্রত্যেক আবেদনকারীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের অতিরিক্ত ফি দিতে হয়, যা বর্তমানে সাধারণত প্রতি বছর ১ হাজার ৩৫ পাউন্ড। তাই পাঁচ বছরের ভিসা নিলে মূল ভিসা ফি ছাড়াও কয়েক বছরের স্বাস্থ্যসেবা ফি যুক্ত হয়ে মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্য হতে পারে।

আবেদন করার নিয়মঃ

বাংলাদেশ থেকে আবেদন করতে হলে প্রথমে নিজের যোগ্যতা কোন পথের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নির্ধারণ করতে হবে। গবেষক হলে গবেষণা ও একাডেমিক পথ, প্রযুক্তিবিদ হলে ডিজিটাল প্রযুক্তি পথ এবং নকশাবিদ হলে নতুন নকশা শিল্পের পথ বিবেচনা করতে হবে।

অনুমোদন প্রয়োজন হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত সংস্থার কাছে অনুমোদনের আবেদন করতে হয়। গবেষণা অনুদানভিত্তিক পথের ক্ষেত্রে অনুদান, কর্মসংস্থান বা আয়োজক প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দিতে হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে গবেষণার কাজ, প্রকাশনা, পুরস্কার, পেশাগত অবদান, নেতৃত্বের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দলিল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অনুমোদন পাওয়ার পর সাধারণত তিন মাসের মধ্যে ভিসার আবেদন করতে হয়। ভিসার আবেদন অনলাইনে করা যায় এবং পরিচয় ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পর আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বিদেশ থেকে আবেদন করলে সাধারণত তিন সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা, আর যুক্তরাজ্যের ভেতর থেকে আবেদন করলে সাধারণত আট সপ্তাহ সময় লাগে।

কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেনঃ

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, জীবনবিজ্ঞান গবেষক, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিবিদ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি গবেষক এবং আন্তর্জাতিক মানের নকশাবিদদের জন্য এই পথটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিশেষ করে যাদের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা, গবেষণা অনুদান, ফেলোশিপ, পেশাগত পুরস্কার, উদ্ভাবন, গবেষণা প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অথবা নিজ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে, তাদের নিজেদের যোগ্যতা গ্লোবাল ট্যালেন্টের মানদণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থার হিসাবে, অনুমোদিত অর্থদাতা পথের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১৩০টির বেশি দেশের ১২ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রতিভাবান মানুষ যুক্তরাজ্যে গবেষণা ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নতুন করে শতাধিক গবেষণানির্ভর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ায় সেই সুযোগের পরিধি আরও বাড়ল।

সূত্রঃ ইউকে রিসার্চ & ইনোভেসন\ইউকে.গভ

এম.কে

আরো পড়ুন

সেফ এক্সিটের আলামতঃ লাল পাসপোর্ট ছাড়ছেন উপদেষ্টারা

যুক্তরাজ্যে বঞ্চিত এলাকায় ডাক্তার সংকট, চরম ঝুঁকিতে স্বাস্থ্যসেবা

ইইউ সেটেলমেন্ট স্টেটাসে আবেদনের শেষ মুহূর্ত

অনলাইন ডেস্ক