ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় অবৈধ অভিবাসন বন্ধে ক্ষমতায় গেলে রয়্যাল নেভিকে ব্যবহার করে নজিরবিহীন সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে। দলটির দাবি, ‘অপারেশন ফোর্ট্রেস’ নামে এই পরিকল্পনার আওতায় অনুমতি ছাড়া চ্যানেল অতিক্রমের চেষ্টা করা প্রতিটি নৌকা আটকিয়ে যাত্রীদের ফ্রান্স অথবা বেলজিয়ামে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
রিফর্ম ইউকের মতে, এটি হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। দলের নেতা নাইজেল ফারাজ ক্ষমতায় এলে রয়্যাল নেভিকে নির্দেশ দেবেন, যাতে কোনো অননুমোদিত নৌকাই যুক্তরাজ্যের উপকূলে পৌঁছাতে না পারে।
দলটির স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বলেন, বর্তমান ও সাবেক সরকারগুলো অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে চ্যানেলে কঠোর নজরদারি চালিয়ে প্রতিটি নৌকা আটকানো হবে। আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার ও পানি দেওয়ার পর নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হবে।
রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনায় রয়্যাল নেভি, রয়্যাল মেরিনস, রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে একটি যৌথ সামরিক কমান্ড গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি চ্যানেলে প্রবেশকারী নৌযান শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জরুরি আইন প্রণয়নের কথাও জানিয়েছে দলটি।
দলটির এই ঘোষণা আসে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতা-তে সাম্প্রতিক অভিবাসন সংকটের পর। গত সপ্তাহে মরক্কো থেকে ৬০ হাজারের বেশি অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করলে স্পেন দ্রুত অভিযান চালিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের অধিকাংশকে সীমান্ত পেরিয়ে মরক্কোতে ফেরত পাঠায়। রিফর্ম ইউকের দাবি, এই ঘটনাই যুক্তরাজ্যে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
তবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ রিফর্ম ইউকের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেছেন, স্পেনের সেউতা পরিস্থিতি এবং ইংলিশ চ্যানেলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মরক্কো ও স্পেনের মধ্যে স্থলসীমান্ত থাকায় তাদের মধ্যে বিশেষ প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্যে অভিবাসীরা ফরাসি ও ব্রিটিশ জলসীমা অতিক্রম করে আসে, ফলে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল এবং একই পদ্ধতি এখানে কার্যকর করা সম্ভব নয়।
শাবানা মাহমুদ আরও বলেন, ইংলিশ চ্যানেলে মানবপাচার চক্র সক্রিয় থাকায় অবৈধ পারাপার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ প্রত্যাবাসন চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্য অবৈধভাবে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা একজন অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে ফ্রান্স থেকে একজন বৈধ আশ্রয়প্রার্থীকে গ্রহণ করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত এই চুক্তির আওতায় ৯২১ জন অবৈধ অভিবাসীকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং বিনিময়ে ৮৯৬ জন আশ্রয়প্রার্থীকে যুক্তরাজ্য গ্রহণ করেছে।
এদিকে, নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, তার সরকারও ছোট নৌকায় অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত বছরের তুলনায় চ্যানেল পার হয়ে আসা অভিবাসীর সংখ্যা কমেছে এবং এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রায় দুই হাজার অভিবাসী ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অভিবাসন ইস্যু যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে আবারও প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে রিফর্ম ইউকে সামরিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে সরকার বলছে আন্তর্জাতিক আইন, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং বিদ্যমান কূটনৈতিক চুক্তির কারণে স্পেনের সেউতা মডেল সরাসরি যুক্তরাজ্যে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

