21 C
London
September 7, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

৩০ বছরের অপেক্ষার অবসানঃ ৫২ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করলেন অদম্য হাবিবুল্লাহ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হলের করিডরে গত ২ সেপ্টেম্বর মুহূর্তটি হয়ে উঠেছিল আবেগঘন। দীর্ঘ তিন দশকের অপেক্ষার পর মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানতে পারেন, তিনি চূড়ান্ত এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ৫২ বছর বয়সে নামের পাশে ‘ডা.’ যুক্ত করার এই সাফল্য শুধু একটি শিক্ষাগত অর্জন নয়; দীর্ঘ প্রতিকূলতা, ব্যক্তিগত শোক ও শিক্ষাজীবনের নানা বাধা পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

হাবিবুল্লাহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষের কে-৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তার এমবিবিএস শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০১ সালে। কিন্তু নানা ঘটনার কারণে সেই শিক্ষাজীবন থেমে যায়। প্রায় দুই দশক পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর ২০২২ সালে তিনি আবার নিজের পুরোনো স্বপ্ন পূরণের সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে এসে তিনি এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।

হাবিবুল্লাহর জন্ম ১৯৭৪ সালে কিশোরগঞ্জের রহিমপুরে। তার বাবা ডা. আবু বকর মোহাম্মদ সিদ্দিক ছিলেন কিশোরগঞ্জের প্রথম এমবিবিএস চিকিৎসক। বাবার চাকরির সুবাদে কিশোরগঞ্জের পাশাপাশি কক্সবাজার ও রাঙামাটিতেও তার শৈশব কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের। প্রকৃতি, নদী, সমুদ্র ও সবুজ পরিবেশ তার জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।

১৯৯২ সালে রামানন্দ হাই স্কুল, বর্তমানে কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রথম হয়ে রায় সাহেব মেমোরিয়াল গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড পান হাবিবুল্লাহ। এরপর তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু আবাসনসংকট, খাওয়াদাওয়ার সমস্যা ও প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে মাত্র তিন মাস পর তাকে কলেজ ছাড়তে হয়। পরে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

শিক্ষাজীবনে পরীক্ষাভীতিও তার জন্য বড় বাধা ছিল। পরীক্ষার প্রায় এক মাস আগে থেকেই তীব্র পরীক্ষাভীতি দেখা দিত। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন এবং প্রায় সব পরীক্ষাই অসুস্থ অবস্থায় দিতে হয়েছিল।

১৯৯৫-৯৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই মনোরোগবিদ্যার প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। তৎকালীন মানসিক রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ এস মোহাম্মদ ফিরোজের অধীনে সাইকিয়াট্রিতে তার আগ্রহ আরও গভীর হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক পত্রিকা ‘মনোজগৎ’-এর সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি।

তবে ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে একটি মানবিক উদ্যোগ তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অসুস্থ সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোমেন তালুকদারের চিকিৎসার জন্য তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হাবিবুল্লাহ। বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তিনি উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে শিক্ষকদের বিরোধ তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিকবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এমনকি তৎকালীন অধ্যক্ষ তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ৫০০ বছরেও এমবিবিএস পাস করতে পারবে না।’ হাবিবুল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময়ের মানসিক চাপ ও ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন।

এরপর তার জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার সময়। ২০০০ সালে তিনি বাবাকে হারান। এর প্রায় দুই বছর পর স্ত্রীকেও হারান। ব্যক্তিগত শোক, শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার বেদনা তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। যে মানুষটি নিজে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাকেই দীর্ঘ সময় নিজের মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

জীবন চালিয়ে নিতে কিশোরগঞ্জে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। নিজের মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পারার গ্লানি দীর্ঘদিন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই সময়ে তার বড় ভাই লুৎফুর রহমান সিদ্দিকী তাকে বারবার নতুন করে জীবন শুরু করার সাহস জুগিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে সিদ্ধান্ত নেন, বয়স যতই হোক, অসমাপ্ত চিকিৎসাশিক্ষা শেষ করবেন। কিন্তু প্রায় ২৫ বছর আগের শিক্ষাজীবনের নথিপত্র খুঁজে পাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম মামুন পুরোনো ফাইল খুঁজে বের করে তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সহায়তা করেন।

এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষ সভা বসে। ৭৮ সদস্যের কাউন্সিলের সামনে নিজের জীবনের ঘটনাগুলো তুলে ধরেন হাবিবুল্লাহ। তার বক্তব্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাউন্সিল তাকে আবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। তবে তাকে প্রায় দুই লাখ টাকা জরিমানা দিতে হয় এবং এক বছর নিয়মিত ওয়ার্ডে কাজ করার শর্ত দেওয়া হয়।

২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনি নিয়মিত ওয়ার্ড ক্লাস করেন। নিজের বয়সের তুলনায় প্রায় ২২ বছরের ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আবার শ্রেণিকক্ষে বসা এবং ওয়ার্ডে কাজ করা তার জন্য ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বয়সকে বাধা হতে দেননি তিনি।

এরপর সার্জারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হন। মাঝখানে আবার দুই বছরের বিরতি এলেও শেষ পর্যন্ত বাকি পরীক্ষাগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন করেন। গত ২ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে।

তার এই সাফল্যে শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আবেগ ও প্রশংসা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ও নিউনেটাল বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু বলেন, দীর্ঘ ২০ বছর পর পড়াশোনায় ফিরে আসায় হাবিবুল্লাহর মধ্যে শুরুতে অনিশ্চয়তা ছিল। তাকে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে তার সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়াকে তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রাজিবুর রহমানও হাবিবুল্লাহর সাফল্যকে অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, জীবনের কোনো পর্যায়েই নতুন করে শুরু করার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ চাইলে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে—হাবিবুল্লাহ তার বাস্তব উদাহরণ।

তবে এত বড় সাফল্যের দিনেও হাবিবুল্লাহর মনে রয়েছে গভীর আফসোস। সময়মতো পড়াশোনা শেষ করতে না পারায় তার মা অনেক কেঁদেছিলেন। আজ বাবা-মা দুজনই বেঁচে নেই। তাই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চিকিৎসক হয়ে ওঠার খবরটি জানাতে না পারার আক্ষেপ থেকেই গেছে তার মনে।

কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে তার এক বছরের ইন্টার্নশিপ। এরপর মনোরোগবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা রয়েছে ডা. হাবিবুল্লাহর। ৫২ বছর বয়সে এমবিবিএস পাসের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ করেননি, বরং প্রমাণ করেছেন—বয়স, ব্যর্থতা কিংবা দীর্ঘ বিরতিও ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের কাছে শেষ পর্যন্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

এম.কে

আরো পড়ুন

মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে আটক আজহারী, ফেরত পাঠাতে পারে দেশে

সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা এখন জামায়াতের সভাপতি!

বাংলাদেশিদের ওমরাহ ভিসা কমিয়েছে সৌদি আরব