ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গোপন প্রযুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপের জেরে যুক্তরাজ্যের সামরিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি মস্কো।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ব্রিটেনকে সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনকে সংবেদনশীল ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ‘আগুন নিয়ে খেলছে’। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লন্ডনের এমন অবস্থান চলমান যুদ্ধকে আরও বড় ও নতুন মাত্রার সংঘাতে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ব্রিটিশ সরকার সোমবার ঘোষণা করে, ইউক্রেনকে ‘স্টর্ম শ্যাডো’ দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিবদ্ধ প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। এই ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। ফ্রান্সও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সংঘাতের আগুনে আরও জ্বালানি যোগ করছে। মস্কো একই সঙ্গে অভিযোগ করেছে, যুক্তরাজ্য প্রক্সির মাধ্যমে রাশিয়াকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা যত গভীর হবে, এর জন্য ব্রিটেনকে তত বেশি মূল্য দিতে হবে। লন্ডনের কর্মকাণ্ডের ‘অনিবার্য পরিণতি’ হবে বলেও সতর্ক করেছে রাশিয়া।
এদিকে রাশিয়ার সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রেমলিনের উপদেষ্টা আন্দ্রেই ফেদোরভ যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ‘আধা-সামরিক’ তৎপরতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইউক্রেনের জন্য ড্রোন তৈরি করা ব্রিটিশ কারখানাগুলো ‘অজ্ঞাত উৎসের’ মাধ্যমে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
ফেদোরভ বলেন, রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া শুধু মৌখিক সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সাইবার হামলা কিংবা ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযানও থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তবে এসব হামলা সরাসরি রাশিয়ার নামে নাও হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিটেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার ম্যালকম রিফকিন্ড রাশিয়ার হুমকিকে মূলত ‘সাবার র্যাটলিং’ বা শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি সম্ভাব্য সাইবার হামলা বা সামরিক তৎপরতার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্রান্ট শ্যাপসও সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটেনের জন্য রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নাও হতে পারে। তার মতে, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প, সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে গোপন বা পরোক্ষ অভিযানই বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার রাশিয়ার হুমকির কাছে নতি স্বীকারের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেনকে আত্মরক্ষায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত থাকবে এবং রাশিয়াকে ব্রিটেন ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
বার্নহ্যাম চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। সফরে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ইউক্রেনের প্রতি ব্রিটেনের ‘অটল’ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
কিয়েভ সফরের সময় বার্নহ্যাম ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলোকে আরও বেশি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। রুশ হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনকে সহায়তা করতে মিত্রদের নিজেদের মজুত থেকে অস্ত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এদিকে ব্রিটেনে রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাজ্য সরাসরি রুশ প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব হুমকির অর্থ এই নয় যে যুক্তরাজ্যে রাশিয়ার হামলা আসন্ন বা অনিবার্য। রুশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যকে সতর্কবার্তা ও চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একই সময়ে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সম্ভাব্য সাইবার হামলা, নাশকতা ও অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে ‘স্টর্ম শ্যাডো’ প্রযুক্তি দেওয়ার ব্রিটিশ সিদ্ধান্ত শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ নয়, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। মস্কোর কঠোর হুঁশিয়ারি এবং লন্ডনের পাল্টা দৃঢ় অবস্থানের কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও কতটা বাড়ে, এখন সেটিই নজরে রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
এম.কে

