TV3 BANGLA
দুই তরুণ গবেষক ইরফান আল হুসাইনি ও তার স্ত্রী ফাবিয়া ফারলিন অ্যাথেনা। ছবি: সংগৃহীত
আমেরিকাবাংলাদেশ

ইউএস সিলিকন ভ্যালিতে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর মৃত্যুঃ স্ত্রী ও পরিবারের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা পরীক্ষকের দেওয়া আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে তার পরিবার। তবে পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত তার মৃত্যুর ঘটনায় অন্য কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে (ডব্লিউএসজে) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইরফানের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার পরিবার ও স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ, পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ এবং তদন্তের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে।

৩২ বছর বয়সী ইরফান এনভিডিয়ার জ্যেষ্ঠ ডেটা বিজ্ঞানী ছিলেন। গত ২২ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে নিজের বাসার রান্নাঘরে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় অচেতন পাওয়া যায়। আট দিন পর ৩০ জুলাই তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে চিকিৎসা পরীক্ষক যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা মেনে নিতে পারছে না ইরফানের পরিবার। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং পালো আল্টো সিটি হলের সামনে বিক্ষোভ করেছেন স্বজনরা। তাদের হাতে ছিল ‘ইরফানের জন্য বিচার চাই’ এবং ‘আমরা উত্তর চাই’ লেখা ব্যানার।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলও ইরফানের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পালো আল্টো পুলিশকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।

পরিবারের আইনজীবী টনি ব্রাস গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরফানের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ইরফান ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সক্রিয় ছিলেন। মৃত্যুর আগে কর্মস্থল থেকে ছুটিও চেয়েছিলেন। আত্মহত্যার পরিকল্পনা থাকলে তিনি কেন ছুটি চাইবেন এবং কেন কোনো সুইসাইড নোট রেখে যাননি, সেই প্রশ্ন তোলেন আইনজীবী।

তবে পালো আল্টো পুলিশের লেফটেন্যান্ট নিকোলাস মার্টিনেজ জানিয়েছেন, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্য কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২২ জুলাই সকালে ইরফানের সহকর্মীদের কাছে পাঠানো একটি বার্তাও পরিবারের সন্দেহের কারণ হয়েছে। ডব্লিউএসজের পর্যালোচনা করা কর্মস্থলের বার্তা অনুযায়ী, ইরফানের স্ত্রী ফাবিয়া ফারলিন অ্যাথেনা অসুস্থ থাকায় ইরফান দিনের বাকি সময় ছুটি নেবেন বলে সহকর্মীদের জানানো হয়েছিল। এর প্রায় ২০ মিনিট পর অ্যাথেনা জরুরি নম্বর ৯১১-এ ফোন করে জানান, রান্নাঘরে স্বামীকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

পরিবারের দাবি, চিকিৎসকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইরফানের মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবজনিত ক্ষতির মাত্রা নিয়ে ঘটনার সময়কাল সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে। তবে অ্যাথেনার আইনজীবী ম্যাথিউ ডেভিস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, পর্যালোচনা করা চিকিৎসা নথিতে ইরফান ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অক্সিজেনবঞ্চিত ছিলেন—এমন দাবির সমর্থন নেই।

ইরফানের মৃত্যুর পাশাপাশি তার দাম্পত্য জীবন নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। গত ২ অক্টোবর পালো আল্টো পুলিশের কাছে জমা দেওয়া এক স্মারকলিপিতে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ইরফান দাম্পত্য জীবনে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং তার স্ত্রী আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে দিয়েছিলেন।

পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ইরফান সাময়িকভাবে তার বোন সারাহ আল-হুসাইনির সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। সে সময় তিনি বোনকে হাতে লেখা কয়েকটি নোটের ছবি দেখিয়েছিলেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নোটগুলোতে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে কথা না বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরফানের স্বাক্ষর ছিল। এ ছাড়া তার স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করতেন বলেও ইরফান বোনকে জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অ্যাথেনার আইনজীবী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি নোটগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, অ্যাথেনা কখনো তার স্বামীকে এ ধরনের কোনো নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেননি। তাদের দাম্পত্য সম্পর্ককে তিনি ভালোবাসাপূর্ণ বলেও বর্ণনা করেন।

সান্তা ক্লারা কাউন্টির চিকিৎসা পরীক্ষকের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বাসায় শারীরিক সংঘর্ষ বা অন্য কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইরফানের ২০২৪ সালের থেরাপি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় তার নিজের বক্তব্যের ভিত্তিতে পারিবারিক নির্যাতনের কিছু ঘটনার উল্লেখ পাওয়া গেছে বলে ডব্লিউএসজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইরফানের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাথেনাকে ঘিরে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তার আইনজীবীর দাবি, অ্যাথেনা অনলাইনে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সহকর্মীদের কাছেও ইরফানের সমর্থকদের পক্ষ থেকে অভিযোগসংবলিত ইমেইল পাঠানো হয়েছে।

অ্যাথেনার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তিনি গোসল ও নামাজের জন্য গিয়েছিলেন। পরে বাসায় ফিরে রান্নাঘরে স্বামীকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সেবায় ফোন করেন। তার আইনজীবী জানান, ৯১১ অপারেটরের নির্দেশনা অনুসরণ করে অ্যাথেনা ইরফানকে নিচে নামানোর পর সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যাম্পাসে বেড়ে ওঠা ইরফান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষা নেন। সেখানে তিনি স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেন। মৃগীরোগীদের খিঁচুনি শনাক্ত করার একটি প্রযুক্তিগত কাঠামো উদ্ভাবনে অবদানের জন্য ২০২৩ সালে তিনি পুরস্কারও পান।

তার গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ক্যাসি মিচেল ডব্লিউএসজেকে জানান, গবেষণাগারে শেষ বছরে ইরফান অসাধারণ অগ্রগতি করেছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক বছরের সমপরিমাণ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তিনি।

ইরফানের স্ত্রী অ্যাথেনাও বুয়েটে পড়াশোনা করেছেন। পরে জর্জিয়া টেকে তাদের পরিচয় হয়। অ্যাথেনা পরবর্তী সময়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। অন্যদিকে ইরফান এনভিডিয়ার জ্যেষ্ঠ ডেটা বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালে জর্জিয়া টেক এই দম্পতিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় উদীয়মান প্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে এআই প্রযুক্তির বিদ্যুৎ খরচ কমানোর গবেষণার জন্য অ্যাথেনা ফোর্বসের ২০২৫ সালের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’ তালিকায় স্থান পান।

ডব্লিউএসজের তথ্য অনুযায়ী, এনভিডিয়ায় ইরফানের বার্ষিক মূল বেতন ও শেয়ারভিত্তিক সুবিধা মিলিয়ে তার পারিশ্রমিক ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ডলার।

ইরফানের মৃত্যুর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মরণসভা ও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া, জর্জিয়া টেক এবং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে আগস্ট মাসে বুয়েটের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মানববন্ধন করে তার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে পরিবারের পক্ষ থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টাকে একটি আবেদনপত্র দেওয়া হয়। একই মাসের শেষ দিকে পালো আল্টো সিটি হলের সামনেও বিক্ষোভ করেন স্বজনরা। ডব্লিউএসজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের মৃত্যুর বিচার দাবিতে তৈরি একটি ফেসবুক পেজে আট হাজারের বেশি অনুসারী যুক্ত হয়েছেন। অনলাইন আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ।

পরিবার আদালতের মাধ্যমে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে সেই আইনি লড়াইয়ে তারা হেরে যায়। ইরানের বোন সারাহ ভাইয়ের আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ইরান জীবনকে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহার মনে করতেন। তার পরিচিত ভাই কখনো নিজের জীবন শেষ করতে পারেন না।

অন্যদিকে অ্যাথেনার আইনজীবীর বক্তব্য, চিকিৎসা পরীক্ষকের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে পরিবার অভিযোগগুলো সামনে আনছে। তার দাবি, অ্যাথেনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

ইরানের বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীরাও তার মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটার সফটওয়্যার প্রকৌশলী মো. ওবায়দুল হোসেন ডব্লিউএসজেকে বলেন, এনভিডিয়ায় ইরানের দ্রুত পেশাগত উন্নতি তাকে বিস্মিত করেছিল। তারা এখনো মনে করেন, সবকিছু যেন দুঃস্বপ্নের মতো; ঘুম ভাঙলেই হয়তো ইরান আবার ফিরে আসবেন।

ইরানের পরিবার এখনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার মৃত্যুর ঘটনায় অন্য কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সূত্রঃ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

এমকে

আরো পড়ুন

ঢাকা-রোম বিমানের ফ্লাইটে তীব্র দুর্গন্ধ, চার ঘণ্টা যাত্রীদের ভোগান্তির পর উড্ডয়ন অনুমতি

সিলেট থেকে যে কারণে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে না লন্ডনে

কয়েকজন উপদেষ্টা আখের গুছিয়ে সেফ এক্সিটের বিষয়ে ভাবছেনঃ নাহিদ