যুক্তরাজ্যের গাড়ি শিল্প চীন ও ইউরোপের বাজারের মধ্যে একটি কঠিন বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। সস্তা চীনা গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। কারণ, চীনা গাড়িতে শুল্ক না দিলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রিটিশ গাড়ি রপ্তানির ওপর নতুন সুরক্ষামূলক বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য বর্তমানে চীনা গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপ না করা দেশগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িতে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাজ্য যদি সস্তা চীনা গাড়িতে শুল্ক না বসায়, তাহলে ব্রিটিশ রপ্তানিপণ্যের ওপর ‘ইউরোপে তৈরি’ ধরনের নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাতারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তবে যুক্তরাজ্য সরকার এখন পর্যন্ত শুল্ক আরোপের আহ্বান থেকে দূরে রয়েছে। ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস বলেছেন, চীনা গাড়িতে শুল্ক আরোপ করা হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এতে চীনের বাজারে ব্রিটিশ নির্মাতাদের বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে চীনা গাড়ির কম দাম ব্রিটিশ ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। গাড়ি ব্যবসা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান অটো ট্রেডারের বাণিজ্যিক পরিচালক ইয়ান প্লামার বলেন, চীনা ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিযোগিতা গাড়ির দামকে আরও সাশ্রয়ী করেছে এবং নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মানুষকে উৎসাহিত করছে।
শিল্প খাতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে বিওয়াইডি, ওমোডা ও জেকু-এর মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোর যুক্তরাজ্যের নতুন গাড়ির বাজারে অংশীদারত্ব তিন গুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে নতুন গাড়ির নিবন্ধন ১২ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালের পর এটিই ছিল বার্ষিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী সেপ্টেম্বর। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও চীনা ব্র্যান্ডগুলোর বাড়তি চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ‘ইউরোপে তৈরি’ বিধিনিষেধ নিয়ে ব্রিটিশ গাড়ি শিল্পে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব বিধিনিষেধ কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে তৈরি গাড়িকে ভর্তুকি, কর ছাড় ও সরকারি ক্রয়চুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাতাদের জন্য ইউরোপীয় বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্য থেকে রপ্তানি হওয়া গাড়ির প্রায় ৫৮ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে গেছে। একই সময়ে চীনে গেছে প্রায় ৪ শতাংশ।
সোসাইটি অব মোটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডার্সের প্রধান নির্বাহী মাইক হাওয়েস বলেন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গাড়ি শিল্প পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ব্রিটিশ উৎপাদিত গাড়িকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় বাজার থেকে কার্যত বাদ দেওয়া হলে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে চীনা গাড়ি নির্মাতা চেরির যুক্তরাজ্য শাখার উপপ্রধান ভিক্টর ঝ্যাং বলেন, তাদের বিক্রি হওয়া গাড়ির বড় অংশই হাইব্রিড এবং এসব গাড়ি বর্তমানে আলোচিত শুল্কের আওতায় পড়ে না। তিনি বলেন, শুল্ক পরিবর্তন হলেও যুক্তরাজ্যে তাদের চলমান বিনিয়োগের পরিকল্পনা পরিবর্তন হবে না।
২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়ানোর পর চীনা গাড়ির বিক্রির গতি কমে যায়। তবে এরপর চীনা নির্মাতারা হাইব্রিড গাড়ির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে ইউরোপে চীনা হাইব্রিড গাড়ির আমদানি দ্রুত বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের গাড়ি শিল্পের একটি অংশ মনে করছে, চীনা গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ করা হলে দেশীয় নির্মাতাদের বাজার ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। ভক্সহলের সাবেক চেয়ারম্যান টিম টোজার বলেন, ব্রিটিশ গাড়ি শিল্পকে আরও দুর্বল হয়ে পড়া ঠেকাতে শুল্ক ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।
এদিকে যুক্তরাজ্য সরকারকে এখন চীন ও ইউরোপের বাজারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অবস্থান নির্ধারণের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগ ব্রিটিশ গাড়ি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকারও দেশটির গাড়ি নির্মাতাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

