লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত থাকলেও, চলতি বছর সেই অবস্থান হারিয়েছে। যাত্রী পরিবহনের দিক থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর এখন ইউরোপের শীর্ষ ব্যস্ততম বিমানবন্দর হিসেবে উঠে এসেছে। বৈশ্বিক সংঘাত, সীমিত ধারণক্ষমতা, রাতের ফ্লাইটে বিধিনিষেধ এবং বহু বছর ধরে তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণে বিলম্ব—এসব কারণকে হিথ্রোর অবনতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪৪৫ জন যাত্রীর ব্যবধানে হিথ্রো ইস্তাম্বুলের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তবে জুন মাসে হিথ্রোতে যাত্রীসংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৮ শতাংশ কমে যায়। বিপরীতে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের যাত্রী ও ফ্লাইট পরিচালনা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় জুলাই থেকেই এটি ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দরে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
হিথ্রো কর্তৃপক্ষের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরবগামী বেশ কিছু ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় যাত্রীসংখ্যা কমেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও ভার্জিন আটলান্টিকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ফ্লাইট বন্ধ থাকাও এর প্রভাব ফেলেছে। যদিও একই অঞ্চলের সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ থাকা সত্ত্বেও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
জুনের শেষ সপ্তাহে বজ্রঝড়ের কারণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্রায় ১৫০টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আনুমানিক ২৫ হাজার যাত্রী কম ভ্রমণ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিথ্রোতে অতিরিক্ত পরিচালন সক্ষমতা না থাকায় সামান্য বিঘ্নও দ্রুত বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়।
রাশিয়ার সঙ্গে বিমান যোগাযোগের ক্ষেত্রেও হিথ্রো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়াগামী ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও, তুরস্ক এখনো রাশিয়ার সঙ্গে নিয়মিত বিমান চলাচল অব্যাহত রেখেছে। ফলে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর অতিরিক্ত ট্রানজিট যাত্রী আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হিথ্রোর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর ধারণক্ষমতা। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত দুই রানওয়ে বিশিষ্ট বিমানবন্দর হলেও রাতের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট সময় বিমান ওঠানামা বন্ধ থাকে। অন্যদিকে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে তিনটি প্রধান রানওয়ে একসঙ্গে ব্যবহার করা যায় এবং সেখানে ২৪ ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হিথ্রোর তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণ প্রকল্পও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে প্রকল্পটি বারবার বিলম্বিত হয়েছে। অনুমোদন মিললেও ২০৩০-এর দশকের শেষ ভাগের আগে নতুন রানওয়ে চালু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে গ্যাটউইক, লুটন, স্ট্যানস্টেড ও সাউথএন্ড বিমানবন্দর নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গ্যাটউইক অতিরিক্ত একটি রানওয়ে আংশিক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৪০ শতাংশ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে হিথ্রোতে যাত্রীদের উচ্চ বিমানভাড়া ও সীমিত ফ্লাইটের বিকল্পের মুখোমুখি হতে হবে। তবে সব বিমানবন্দর মিলিয়ে লন্ডন এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

