ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দেওয়ার পর এবার ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মস্কো গোপনে ইরানকে উন্নত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা রুশ নথি, কর্মকর্তাদের ভ্রমণ-তথ্য এবং সামরিক পেটেন্ট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু বছরের এই গোপন কর্মসূচির সাংকেতিক নাম ‘সি৪৩০এল’। প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ইরানকে র্যামজেট প্রপালশন প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে সহায়তা করা। র্যামজেট এমন এক ধরনের ইঞ্জিন, যা ক্ষেপণাস্ত্রকে উড্ডয়নের সময় বাতাস ব্যবহার করে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে চলতে সক্ষম করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের কয়েক গুণ গতিতে দীর্ঘ সময় উড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি মূলত জাহাজবিধ্বংসী ও স্থলভাগে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি পরিচালনায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রসোবোরোনএক্সপোর্ট এবং ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার ভূমিকা রয়েছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের কয়েকজন ইরানে একাধিকবার সফর করেছেন এবং প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক চুক্তি ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।
নথিতে আরও দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ইরান র্যামজেট ব্যবস্থা নিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তিগত তথ্য রুশ প্রকৌশলীদের কাছে পাঠায়। রুশ বিশেষজ্ঞরা ইরানের একটি উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থিতিশীলতা, বায়ুপ্রবেশ ব্যবস্থা এবং ইঞ্জিনের অগ্রভাগসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। অর্থাৎ শুধু নকশা বা প্রযুক্তি হস্তান্তর নয়, ইরানের তৈরি ব্যবস্থার কারিগরি সমস্যাগুলো সমাধানেও রুশ প্রকৌশলীরা সরাসরি কাজ করেছেন বলে নথিতে ইঙ্গিত রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে রসোবোরোনএক্সপোর্ট প্রায় দুই ডজন রুশ বিশেষজ্ঞকে ইরানে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালেও দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা এবং রুশ প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে।
এই সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় ইরানের দীর্ঘদিনের সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার কারণে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বহু বছর ধরে এই প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে। দেশটি এরই মধ্যে একটি র্যামজেট ইঞ্জিন তৈরি ও পরীক্ষাও করেছে। তবে রুশ সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক বাহিনীতে কার্যকরভাবে মোতায়েন হয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ অস্ত্র গবেষণা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ান হিনৎসের মতে, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঘটনা। তার মতে, র্যামজেটভিত্তিক কার্যকর অস্ত্র তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ রুশ প্রকৌশলীদের সরাসরি সহায়তা ইরানের জন্য বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও এই সহযোগিতার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। যুদ্ধের সময় ইরানের তৈরি শাহেদ হামলাকারী ড্রোন রাশিয়ার হাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং রাশিয়াকে নিজস্ব ভূখণ্ডে এসব ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতেও ইরান সহায়তা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক এখন শুধু অস্ত্র কেনাবেচা বা সরবরাহের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তি, প্রকৌশল জ্ঞান ও উৎপাদন সক্ষমতা ভাগাভাগির দিকে এগোচ্ছে। ইরান যদি র্যামজেট প্রযুক্তি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে নিজেদের আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও পরিবর্তন করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা। সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুতগতিতে নিচু উচ্চতায় এগোতে পারলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে শনাক্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাধা দেওয়ার জন্য সময় কমে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের যুদ্ধজাহাজ, সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য এমন অস্ত্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ‘সি৪৩০এল’ প্রকল্প রাশিয়া-ইরান সামরিক সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। ইরান যেমন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোন প্রযুক্তি ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে, তেমনি রাশিয়া এখন ইরানের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ঘাটতি পূরণে সহায়তা করছে বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য, বিশেষ করে সমুদ্রভিত্তিক শক্তির সমীকরণ, আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রঃ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস
এম.কে

