16.9 C
London
June 12, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

এনএইচএসে নজিরবিহীন সংকটঃ প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার রোগীর চিকিৎসা করিডোরে

ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস) নিয়ে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার রোগীকে হাসপাতালের নির্ধারিত ওয়ার্ডে বেড না দিয়ে করিডোর, বারান্দা কিংবা অস্থায়ী স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল বেড সংকটের বিষয় নয়; বরং যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিনের চাপ, জনবল সংকট এবং বাড়তে থাকা রোগীর চাহিদার প্রতিফলন।

নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, করিডোরে সারিবদ্ধভাবে রাখা রোগীদের অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কখনও দিনের পর দিন চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকছেন। পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা মর্যাদা ছাড়াই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে যেখানে করিডোরে থাকা রোগীরা তাদের পাশেই অন্য রোগীর হার্ট অ্যাটাক হওয়া বা মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর অসুস্থ রোগীদের পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের কারণে মে মাসে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগী এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি বিভাগগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে। এর ফলে বেড খালি না হওয়ায় রোগীদের করিডোরে চিকিৎসা দেওয়ার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনএইচএসে এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থার দুর্বলতা, দ্রুত ছাড়পত্র দিতে না পারায় হাসপাতালের বেড দীর্ঘ সময় দখল হয়ে থাকা এবং জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যচাহিদার বৃদ্ধি।

ব্রিটিশ সরকার এই পরিস্থিতিকে “অগ্রহণযোগ্য” এবং “অনিরাপদ” হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকার জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে করিডোরভিত্তিক চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য জরুরি বিভাগে সক্ষমতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বেড স্থাপন, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যখাতের পেশাজীবী সংগঠনগুলো বলছে, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, এনএইচএসকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে হলে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ধরে রাখার কার্যকর কৌশল প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত এনএইচএসের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। করোনা মহামারির পর থেকে জমে থাকা চিকিৎসা চাহিদা, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

রোগীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক শর্ত। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে বহু মানুষ হাসপাতালের করিডোরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে এনএইচএসের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের মতে, করিডোরে চিকিৎসা কখনোই একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। তাই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

পার্সোনাল ইন্ডিপেনডেন্স পেমেন্ট নিয়ে লেবার সরকারে বিদ্রোহ

নিউজ ডেস্ক

স্টারমার লেবার সম্মেলনেঃ ব্রিটেনের ভবিষ্যত নিয়ে মূল ভাষণ

ইংল্যান্ডে পানি দূষণ ৬০% বেড়েছে, তিনটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ