TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ওভারটাইমে আয়কর বাতিলের ঘোষণা নাইজাল ফারাজেরঃ ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজাল ফারাজ। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তার দল ক্ষমতায় এলে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করা কর্মীদের ওভারটাইম আয়ের ওপর আর কোনো ইনকাম ট্যাক্স দিতে হবে না।

রিফর্ম ইউকে জানিয়েছে, বছরে ৭৫ হাজার পাউন্ডের কম আয় করা কর্মীরা এই সুবিধা পাবেন। দলটির দাবি, এই পদক্ষেপ শ্রমজীবী মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ তুলে দেবে এবং অর্থনীতিতে ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।

ম্যানেকারফিল্ড উপনির্বাচনকে সামনে রেখে দেওয়া এই ঘোষণা ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র এন্ডি বার্নহ্যাম-এর জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্নহ্যাম লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফারাজের এই পরিকল্পনা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর “টিপসের ওপর কর বাতিল” নীতির আদলে তৈরি। এর মাধ্যমে রিফর্ম ইউকে নিজেদেরকে “শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত দল” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

শনিবার প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, ম্যানেকারফিল্ড আসনে লেবার পার্টি ৪৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে থাকলেও রিফর্ম ইউকে খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ৪০ শতাংশ নিয়ে। এছাড়া রিস্টোর ব্রিটেন পেয়েছে ৭ শতাংশ সমর্থন।

দ্য টেলিগ্রাফে লেখা এক নিবন্ধে নাইজাল ফারাজ বলেন, “যারা অতিরিক্ত সময় কাজ করেন, তারা মাস শেষে তার যথাযথ প্রতিদান পান না। মানুষ এখন মনে করে এই দেশে কঠোর পরিশ্রমের আর কোনো মূল্য নেই।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই ভাতা থেকে পাওয়া সুবিধা চাকরিজীবীদের আয়ের সমান কিংবা বেশি হয়ে যাচ্ছে।”

লেবার পার্টিকে লক্ষ্য করে ফারাজ বলেন, “যে দল একসময় শ্রমজীবী মানুষের পাশে ছিল, এখন তারা কল্যাণভোগীদের পক্ষেই বেশি অবস্থান নিচ্ছে।”

অন্যদিকে এন্ডি বার্নহ্যামের বিরুদ্ধে ৩৫ বিলিয়ন পাউন্ডের ভূমিমূল্য কর এবং ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ডের সামাজিক সেবা কর আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা চলছে। সমালোচকদের মতে, এসব নীতির ফলে সাধারণ মানুষের করের চাপ আরও বাড়বে।

রিফর্ম ইউকের দাবি, নতুন এই করছাড় নীতি নার্স, পুলিশ কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারীসহ লাখো শ্রমজীবী মানুষের জন্য উপকারী হবে।

ফারাজ উদাহরণ দিয়ে বলেন, হেইঞ্জ কারখানার শ্রমিকরা বছরে এক হাজার পাউন্ডের বেশি সাশ্রয় করতে পারবেন। একইভাবে অতিরিক্ত ছয় ঘণ্টা কাজ করা একজন নতুন নার্স বছরে প্রায় ১,৩০০ পাউন্ড বেশি হাতে রাখতে পারবেন।

এই নীতির বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভিত্তিক ওয়ার্কিং টাইম রেগুলেশন-এ পরিবর্তন আনার কথাও জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো যাতে নিয়মিত কর্মঘণ্টাকে “ওভারটাইম” হিসেবে দেখিয়ে অপব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

রিফর্ম ইউকের হিসাব অনুযায়ী, এই করছাড় কর্মসূচিতে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ হবে। দলটি বলছে, বিদেশিদের কল্যাণ সুবিধা কমানো, বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস, নেট জিরো প্রকল্পে কাটছাঁট এবং সরকারি প্রশাসনে ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে অর্থ জোগাড় করা হবে।

ম্যানেকারফিল্ড উপনির্বাচনের সূত্রপাত হয় সাবেক মন্ত্রী জস সিমন্স-এর পদত্যাগের মাধ্যমে। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৫ হাজার ৩৯৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। তবে গত স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে ওই এলাকার সব ওয়ার্ডে জয় পেয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

রিফর্ম ইউকে তাদের প্রার্থী রবার্ট কেনিয়ন-এর লড়াইকে “ডেভিড বনাম গোলিয়াথ” হিসেবে তুলে ধরছে।

এদিকে রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মোর ইন কমন-এর জরিপে দেখা গেছে, এন্ডি বার্নহ্যাম লেবার পার্টির নেতৃত্বে এলে দলটি সাধারণ নির্বাচনে রিফর্ম ইউকের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে।

অন্যদিকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্টিটিং নেতৃত্বের লড়াইয়ে সম্পদ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি মূলধনী মুনাফা করকে আয়করের সমপর্যায়ে আনার পরিকল্পনার কথা বলেন, যা থেকে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর জবাবে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী রিচেল রিভিস-এর বর্তমান আর্থিক নীতিমালা পরিবর্তন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এন্ডি বার্নহ্যাম। তিনি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার ওপর জোর দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে করনীতি, শ্রমজীবী মানুষের আয় এবং কল্যাণ ব্যয়—এসব বিষয় এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রেক্সিটের প্রভাব: ইউরোপে ব্রিটিশ খাদ্য-পানীয় রফতানি অর্ধেকে নেমেছে

ব্রেক্সিট: যুক্তরাজ্যের খুচরা বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির শংকা

স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী ফয়ছল চৌধুরী