বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে গুপ্তচরবৃত্তির এসেট হিসেবে গ্রুম করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে চালানো নাটকীয় অভিযানে এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে যায়।
আমেরিকান ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুতে হাঙ্গেরির লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অফ পাবলিক সার্ভিসে একটি জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের আড়ালে মি. আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলি গুপ্তচরদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর প্রফেসর গেরগেলি ডেলি স্বীকার করেছেন যে, হাঙ্গেরিয়ান সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার অনুরোধে তিনি এই সম্মেলন আয়োজনে সহায়তা করেন। তিনি বলেন, “দুই শত্রু যদি কথা বলতে চায়, তাহলে তাদের কথা বলার সুযোগ করে দেওয়াই উচিত।”
সূত্রগুলো জানায়, ইসরায়েলের তৎকালীন মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ২০২৪ সালে বুদাপেস্টে মি. আহমাদিনেজাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন। এরপর মোসাদ সিআইএকে এই যোগাযোগের তথ্য জানায়। ইসরায়েল সাবেক প্রেসিডেন্টকে আবাসন ও ভ্রমণের জন্য অর্থ সাহায্যও প্রদান করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৫ সালের জুন মাসে মি. আহমাদিনেজাদ আবার বুদাপেস্ট সফর করেন, যা যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন আগে ইসরায়েলি গুপ্তচরদের সঙ্গে বৈঠকের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন এবং “সাধারণ মানবতা” ও “বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা” নিয়ে আলোচনা করেন।
যুদ্ধ শুরুর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বিমান হামলায় মি. আহমাদিনেজাদের তেহরানের বাসভবনে আঘাত হানা হয়। হামলার পর একটি কালো পিউজো গাড়িতে মোসাদ অপারেটিভরা তাকে তুলে নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরেই একটি গোপন নিরাপদ আশ্রয়স্থলে নিয়ে যান। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের ধরন নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মি. আহমাদিনেজাদ পরিকল্পনা সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি পরবর্তীতে মোসাদের শেল্টার হাউস হতে চলে যান।
গত সোমবার নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির জানাজার মিছিলে তাকে দেখা যায়। বর্তমানে তিনি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গুপ্তচর শাখার হেফাজতে গৃহবন্দি রয়েছেন বলে জানা গেছে।
২০০৫-২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন মি. আহমাদিনেজাদ ইরানের নিউক্লিয়ার কর্মসূচি ত্বরান্বিত করেন এবং ইসরায়েলবিরোধী কঠোর বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি নিজেকে মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেন, ইংরেজি শেখেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। তার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তিনি বারবার ইরানের ধর্মীয় নেতা খোমেনি কর্তৃক প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর অযোগ্য ঘোষণার কারণে শাসনব্যবস্থার প্রতি হতাশ হয়ে পড়েন এবং ক্ষমতায় ফেরার জন্য বিদেশি সহায়তা চেয়েছিলেন।
ইসরায়েলের পরিকল্পনায় আরও অন্তর্ভুক্ত ছিল ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি বিরোধী বাহিনীকে সশস্ত্র করে তেহরানের দিকে অগ্রসর করা, যা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। মি. আহমাদিনেজাদের মুখপাত্রও কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। সাবেক উপদেষ্টা আব্দোলরেজা দাভারি বলেন, আহমাদিনেজাদ ক্ষমতার লোভে এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, টাকার জন্য নয়।
এই ঘটনা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের জটিলতাকে আরও সামনে এনেছে। বর্তমানে মি. আহমাদিনেজাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সূত্রঃ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
এম.কে

