TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

কনজারভেটিভদের অবহেলায় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর বেহাল দশাঃ অভিযোগ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম এমনকি প্রশিক্ষণের সময় গুলি ছোড়ার মতো পর্যাপ্ত গোলাবারুদও ছিল না—এমন বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। নিজের ছেলের সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, আগের ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনামলে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২৮ অক্টোবর প্রকাশিত লন্ডন লাভস বিজনেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের বাজেট বক্তৃতায় জন হিলি আগের কনজারভেটিভ সরকারকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তার অভিযোগ, দীর্ঘ ১৪ বছরের শাসনামলে কনজারভেটিভ সরকার ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সরঞ্জাম সরবরাহে অবহেলা করেছে।

হিলি জানান, তার ছেলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন রিজার্ভ সদস্য। প্রায় চার বছর আগে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ি ফিরে তার ছেলে জানিয়েছিল, সেনাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এমনকি প্রশিক্ষণের সময় গুলি ছোড়ার জন্যও পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ছিল না। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে আগের সরকারের সমালোচনা করলেও বর্তমান সরকারের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি ২০৩৫ সালের মধ্যে ন্যাটোর বৃহত্তর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু এসব লক্ষ্যে কীভাবে পৌঁছানো হবে, অর্থের সংস্থান কোথা থেকে আসবে এবং কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করা হবে—তার বিস্তারিত পরিকল্পনা আগামী বছরের ব্যয় পর্যালোচনায় প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে সরকার। ফলে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের সময়সূচি ও অর্থায়ন নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন জন হিলি। এর মধ্যে চলতি শীত মৌসুমে জরুরি সামরিক সহায়তা হিসেবে ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড দেওয়া হবে। বৃহত্তর এই সহায়তা প্যাকেজের অর্থায়নে ঋণ এবং রপ্তানি অর্থায়নের নিশ্চয়তা ব্যবহারের কথা রয়েছে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে কিয়েভে আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেন। হিলির ভাষ্য অনুযায়ী, সহায়তার প্রতিশ্রুতি শুনে জেলেনস্কি তাদের বলেছেন, ‘আপনারা আমার দিনটি ভালো করে দিয়েছেন।’ এ সময় হিলি স্পষ্ট করেন, ইউক্রেনের পাশে যুক্তরাজ্যের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদি।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও দাবি করেন, কনজারভেটিভ সরকারের শেষ বছরের তুলনায় চলতি বছর ব্রিটেনের সামরিক বাজেট ১৪ বিলিয়ন পাউন্ড বেশি। তার মতে, সশস্ত্র বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা দিয়ে প্রস্তুত রাখা যেকোনো সরকারের প্রথম দায়িত্ব।

তবে প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আয়মিং ইউকের অংশীদার এনজে রিওস বলেছেন, প্রতিরক্ষা খাতে ৩ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু প্রচলিত সামরিক সরঞ্জাম কেনার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করলে চলবে না।

তার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাই ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা বাজেটে এসব আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ছোট ও মাঝারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্ভাবনী শিল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা না থাকলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা কঠিন হবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকা এবং ইউরোপজুড়ে সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের চাপ বাড়তে থাকায় ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ঘোষণা নয়, বরং সেনাবাহিনীর হাতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়ে বাস্তব সামরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

সূত্রঃ লন্ডন লাভ’স বিজনেস

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের নর্থ লন্ডনের তিনতলা ফ্ল্যাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, তিন শিশু হাসপাতালে

ব্রিটেনে প্রথম সফল উড়ুক্কু ট্যাক্সির যাত্রাঃ ভবিষ্যতের আকাশপথে বিপ্লবের ইঙ্গিত

যুক্তরাজ্যে বছরে ১৮০ পাউন্ড লাইসেন্স ফি, সমালোচনার মুখে বিবিসি কর্তৃপক্ষ

নিউজ ডেস্ক